কলকাতা, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬: বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে মণিপাল হসপিটালস, ইএম বাইপাস ও মুকুন্দপুর-এর উদ্যোগে একটি বিশেষ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্ট্রোক প্রতিরোধ, এর লক্ষণ দ্রুত চিনে নেওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। স্ট্রোকের ঝুঁকি, এর লক্ষণ এবং দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে জানানো হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা ও অক্ষমতার ঝুঁকি কমানো যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মণিপাল হসপিটালস মুকুন্দপুরের নিউরোলজি বিভাগের ডিরেক্টর ও প্রধান ডাঃ জয়ন্ত রায়; মণিপাল হসপিটাল ইএম বাইপাসের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, নিউরোলজি ডাঃ অম্লান মণ্ডল; মণিপাল হসপিটালস, ইস্ট রিজিয়নের নিউরোইন্টারভেনশন ও এন্ডোভাসকুলার সার্জারি বিভাগের ডিরেক্টর ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডাঃ সুকল্যাণ পুরকায়স্থ এবং মণিপাল হসপিটালস ইএম বাইপাসের নিউরোরেডিওলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডাঃ নির্মাল্য রায়। অনুষ্ঠানে স্ট্রোকের বিপদ, এর লক্ষণ চেনার উপায় এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
![]() |
| আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন বিশিষ্ট চিকিৎসকরা। নিজস্ব চিত্র। |
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কের কোনও অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বা মস্তিষ্কের কোনও রক্তনালি ফেটে গেলে স্ট্রোক হতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছতে পারে না। এতে মস্তিষ্কের ক্ষতি, শারীরিক অক্ষমতা, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি, যেখানে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। অনুষ্ঠানে স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত চিনে নেওয়ার জন্য ‘BE FAST’ পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়।
এই পদ্ধতিতে স্ট্রোকের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণের কথা বলা হয়েছে। B অর্থাৎ Balance (ভারসাম্য)—হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারানো, মাথা ঘোরা বা হাঁটতে অসুবিধা হওয়া। E অর্থাৎ Eyes (চোখ)—হঠাৎ ঝাপসা দেখা, দুটি করে দেখা বা দৃষ্টিশক্তি হারানো। F অর্থাৎ Face (মুখ)—মুখের একদিক বেঁকে যাওয়া বা অসাড় হয়ে আসা। A অর্থাৎ Arms (হাত)—হঠাৎ একটি হাতে দুর্বলতা বা অসাড়তা দেখা দেওয়া। S অর্থাৎ Speech (কথা বলা)—কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা হওয়া বা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া। T অর্থাৎ Time (সময়)—এই লক্ষণগুলির কোনও একটি দেখা দিলেই দেরি না করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং কখন থেকে লক্ষণগুলি দেখা দিয়েছে, তা মনে রাখা। এই লক্ষণগুলির মধ্যে একটিও দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
অনুষ্ঠানে ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (TIA) বা সাময়িকভাবে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। একে অনেক সময় স্ট্রোকের আগাম সতর্কবার্তা বলা হয়। TIA হলে স্ট্রোকের মতোই হঠাৎ শরীরের কোনও অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা হওয়া বা দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এই লক্ষণগুলি কিছুক্ষণের মধ্যে চলেও যেতে পারে। কিন্তু লক্ষণ সেরে গেলেই যে বিপদ কেটে গিয়েছে, তা নয়। TIA হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টা ও দিনে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। তাই স্ট্রোকের মতো লক্ষণ দেখা দিলে, চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছনোর আগেই সেগুলি সেরে গেলেও, জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত চিনে নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডাঃ জয়ন্ত রায় বলেন, “স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কাজ করার সময়, গাড়ি চালানোর সময় বা দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন। কখনও হঠাৎ চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া, শরীরের ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা বা শরীরের একদিক দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই লক্ষণগুলি দ্রুত চিনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ চিকিৎসা নিতে দেরি হলে মস্তিষ্কের আরও ক্ষতি হতে পারে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে গেলে রোগীর অবস্থা বুঝে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়, যা ভালোভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।”
তরুণদের মধ্যেও স্ট্রোকের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ডাঃ অম্লান মণ্ডল বলেন, “অনেকেই মনে করেন, স্ট্রোক মূলত বয়স্কদেরই হয়। কিন্তু কম বয়সিদেরও স্ট্রোক হতে পারে। তরুণরা অনেক সময় স্ট্রোকের প্রথম দিকের লক্ষণগুলি গুরুত্ব দেন না। হঠাৎ চোখে দেখতে সমস্যা, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া বা কথা বলতে অসুবিধার মতো লক্ষণকে তাঁরা সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যেতে পারেন। তাই মনে রাখা জরুরি, শুধু বয়স কম বলে স্ট্রোকের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সব বয়সেই স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার মাধ্যমে এই রোগের প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব।”
স্ট্রোক প্রতিরোধে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকির কারণগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে ডাঃ সুকল্যাণ পুরকায়স্থ বলেন, “স্ট্রোকের অনেক ঝুঁকিই সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরি। ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়ার মতো বিষয়গুলিও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ফল ও শাকসবজি-সহ সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার মতো অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা এবং সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে ডাঃ নির্মাল্য রায় বলেন, “স্ট্রোকের লক্ষণ হঠাৎ দেখা দিতে পারে। নিজের থেকেই ঠিক হয়ে যাবে ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করলে গুরুতর সমস্যা হতে পারে। ‘টাইম ইজ ব্রেন’ বা ‘সময়ই মস্তিষ্ক’—এই কথাটির অর্থ হল, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে খুব দ্রুত মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বড় ধরনের ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতি মিনিটে প্রায় ২ কোটি মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হতে পারে। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে TIA-র লক্ষণ সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে স্ট্রোকের মতো লক্ষণ অল্প সময়ের মধ্যে সেরে যেতে পারে। কিন্তু রোগী পুরোপুরি সুস্থ বোধ করলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি, কারণ এটি পরবর্তী সময়ে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকির ইঙ্গিত হতে পারে। রোগীর অবস্থা পরীক্ষা করে সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণের জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।”
অনুষ্ঠানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাবার, শরীরচর্চা এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি, শরীরের ভারসাম্য বা দৃষ্টিশক্তিতে হঠাৎ পরিবর্তন, মুখের একদিক বেঁকে যাওয়া, হাতে দুর্বলতা এবং কথা বলতে অসুবিধার মতো লক্ষণ দ্রুত চিনে নিতে ‘BE FAST’ পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা বলা হয়। এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে, এমনকি কিছুক্ষণের মধ্যে সেরে গেলেও, দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়। স্ট্রোক প্রতিরোধ এবং সময়মতো চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর এই উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপাল হসপিটালস মনে করিয়ে দেয় যে, যে কোনও বয়সেই স্ট্রোক হতে পারে। তাই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতার ঝুঁকি কমাতে এবং রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

0 Comments