বেঙ্গল মিরর ডেস্ক: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক যখন অভিযোগ সামনে আসছে, তখন জুডিশিয়াল অফিসার কর্তৃক কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতির নাম ডিলিট করে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। গত ২৩ তারিখে কিছু সম্পূরক বা সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশন। সেই ভোটার তালিকায় বাদ পড়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তথা রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় স্বাভাবিকভাবে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিচারপতির শহীদুল্লাহ মুন্সি। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত সেই বিচারপতি এ বিষয়টিকে অত্যন্ত অপমানজনক, বেদনা এবং চরম হয়রানির বলে উল্লেখ করেছেন।
জানা গিয়েছে, এর আগে বিচারপতি শহীদুল্লাহ মুন্সির নাম বিবেচনাধীন বা আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন হিসেবে চিহ্নিত ছিল। তারপরে প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশিত হলে দেখা গিয়েছে যে তার নাম মুছে দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ তিনি আর ভোটার হিসেবে থাকতে পারবেন না। এখনও পর্যন্ত তাঁর পরিবারের আরও দুই সদস্য বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছিল, তখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কলকাতা হাইকোর্ট জুডিশিয়াল অফিসারদের দ্বারা বিষয়টি দেখার বন্দোবস্ত করেছিল। সেই জুডিশিয়াল অফিসার কর্তৃক এবার খোদ বাদ পড়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নাম। শুধু তাই নয়, তাঁর বড় ছেলে ইফতেকার মুন্সি এবং তাঁর স্ত্রী সাহানার নাম এখনও বিচারাধীন রয়েছে। ছোট ছেলে ইবতেহাজ নতুন করে ভোটার হিসেবে নাম তোলার জন্য আবেদন করেছেন।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিকে সরাসরি নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োজিত একজন বিচারপতির নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে বিচারপতি শহীদুল্লাহ মুন্সি বলেন, "এই ঘটনা আমার কাছে অত্যন্ত অপমানজনক, বেদনা ও চরম হয়রানির।" শুনানির সময় তিনি সমস্ত নথিপত্র দিয়েছেন এবং সেগুলো যথাবিহিত আপলোড করা হবে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা না হওয়া বলে জানানো হয়েছিল। একজন বিচারপতিকেও কোনও রিসিভ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শহীদুল্লাহ মুন্সি। আর তারপর দেখা গিয়েছে, ২৩ তারিখে তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁকে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে।
শহীদুল্লাহ মুন্সি তাঁর নাম বাদ দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, তিনি পাসপোর্ট-সহ সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছেন। তাঁর কথায়, "আমি জানি না তারা কীভাবে রায় দিয়েছে এবং কীভাবে তারা মুছে দিয়েছে। আমাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। যদি আমাদের জানানো হত যে আরও নথির প্রয়োজন ছিল, আমরা সেগুলি জমা দিতে পারতাম। নথিগুলির একটি তালিকা ছিল এবং যে কোনও একটি যথেষ্ট হওয়া উচিত ছিল।"
জানা গিয়েছে, শহীদুল্লাহ মুন্সি ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টে একজন আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হন এবং ২৭ বছর ওকালতি করেন। তিনি ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে অতিরিক্ত বিচারক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে স্থায়ী বিচারপতি হিসাবে নিযুক্ত হন এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে অবসর গ্রহণ করেন।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শহীদুল্লাহ মুন্সি উল্লেখ করেন, বিচারপতি হওয়ার আগে তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ইতিমধ্যে নথি জমা দিয়েছিলেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, "আমার নথিগুলি ছাড়াও, তারা একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করে। যাচাই-বাছাইয়ের পরে কলেজিয়াম দ্বারা নাম অনুমোদিত হয়। তারপর রাষ্ট্রপতি কাউকে বিচারক নিয়োগ করেন এবং তিনি সংবিধানের শপথ নেন"। শহীদুল্লাহ মুন্সির মনে হয়, তাঁর নাম ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিচার প্রক্রিয়াটি "যান্ত্রিক" ছিল। তাঁর বক্তব্য, "কেউ তাদের বিবেক প্রয়োগ করছে না। অল্প সময়ের মধ্যে ৬০ লাখ (ভোটার) বিচার করতে হবে...কি ঘটবে তা যে কেউ অনুমান করতে পারে। যে কর্মকর্তারা এটি করছেন তারা বিচার করার মতো নয়, যান্ত্রিকভাবে কাজ করছেন।"
সাবেক এই বিচারপতি জানান, তিনি ও তাঁর স্ত্রী বউবাজার আসনে ভোট দিয়েছেন। এখন এন্টালিতে স্থানান্তরিত হয়েছেন। বিচারপতি শহীদুল্লাহ মুন্সি জানান যে আপিল করার আগে তিনি তাঁর নাম বাদ দেওয়ার জন্য সরকারি বা অফিসিয়াল কারণ জানার জন্য অপেক্ষা করছেন। কীভাবে আপিল হবে, কবে শুরু হবে কিছুই জানা যাচ্ছে না ফলে বিষয়টি নিয়ে মানুষের মনে হাজারো প্রশ্ন। কমিশন পশ্চিমবঙ্গে ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা কর্তৃক ৬০ লাখ বিচারাধীন ভোটারের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হবে সেই মামলার আপিলের শুনানি হবে ট্রাইবুনালে। ২৩টি জেলার জন্য সাবেক বিচারপতিদের নেতৃত্বে একক সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। তবে ভোট ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল ভোট হবে আর ৪ মে হবে গণনা হবে। এখন এই বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিতে পারবেন কিনা তা অনিশ্চিত।

0 Comments