আসিফ রেজা আনসারী
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে এর আগে নির্বাচন কমিশনের বহু খামখেয়ালিপণার অভিযোগ সামনে এসেছে। এবার বুধবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চূড়ান্ত আতঙ্ক তৈরি হয় রাজ্যজুড়ে। এ দিন সন্ধ্যায় বহু মানুষ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নিজের নাম এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখতে পেয়েছেন যে তারা সবাই আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন অর্থাৎ 'বিচারাধীন' তালিকার মধ্যে পড়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে তাদের নাম ফ্রেশ অর্থাৎ নির্ঝঞ্ঝাট হিসেবে চিহ্নিত ছিল। তাহলে কেন হঠাৎ করে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন হল, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে শুরু করে যে নির্বাচন কমিশন বৈধ ভোটারকে বিচারাধীন বলে দাগিয়ে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এমনকি এমন বহু মানুষ রয়েছেন যারা সরকারি আমলা, তারাও এই বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকে ব্লক, মহকুমা কিংবা নির্বাচন কমিশনের রাজ্য দফতরে এ বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ শুরু করেন। তাৎক্ষণিক কোন উত্তর না পাওয়া গেলেও কমিশনের তরফে জানা গিয়েছিল এটি একটি টেকনিক্যাল সমস্যা, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তারপর গভীর রাতে দেখা গেল কমিশনের ওয়েবসাইট ঠিক হয়ে গিয়েছে। তবুও বহু মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। ভবিষ্যতে আরও কোনও বিপদে পড়তে হবে না তো ? এমনই প্রশ্ন এবং আতঙ্ক তাড়া করছে সাধারণ মানুষকে।
![]() |
| TBM Graphics |
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় কর্মরত এক সরকারি আমলা যিনি নিজেও ইআরও তিনি জানান, তাঁর বাড়িতে চারজন সদস্য। তার মধ্যে দু'জন সরকারি আমলা। একজন বিচারবিভাগ এবং একজন প্রশাসনিক বিভাগের কর্মরত। তবুও তাদের মায়ের নাম আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন বা বিচারাধীন হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। তাঁর মায়ের সমস্ত নথিপত্র জমা করার পরেও এমনটা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তারপর হঠাৎ বুধবার সন্ধ্যায় তিনি কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে চেক করতে গিয়ে দেখেন তাঁর নাম আন্ডার অ্যাডজুডিকেশনে পড়ে গিয়েছে। তিনি বনগাঁর মহকুমাশাসকের দফতরে যোগাযোগ করেন। আশ্বস্ত করে বলা হয় যে বিষয়টি দেখা হচ্ছে, টেকনিক্যাল সমস্যা হতে পারে। একইভাবে মুর্শিদাবাদের এক সমাজকর্মী অলিউল্লাহ প্রতিবেদককে জানান যে, তাদের যৌথ পরিবারে মোট ১৮ জন ভোটার রয়েছেন। তার মধ্যে তিনজন আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় তারা কমিশনের ওয়েবসাইটে দেখতে পান সকলেই আন্ডার অ্যাডজুডিকেশনে পড়ে গিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে অলিউল্লাহ বলেন, "কমিশনের ওয়েবসাইট সঠিকভাবে কাজ করছেনা নাকি অন্য কোনও ছলচাতুরি চলছে তা বোঝা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ যেন আতঙ্কিত না হয় এই আশ্বস্ত করা কমিশনের প্রধান কর্তব্য। একদিকে বহু মানুষকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষ এ নিয়ে এমনিতে আতঙ্কে রয়েছেন। তার পরে যদি চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম থাকার পরেও বিচারাধীন দেখায় তাহলে মানুষ কাকে ভরসা করবে?"
এ দিকে গত ৪ তারিখ থেকে এসআইআর বিরোধী আন্দোলন করছে বহু মানুষ। পার্ক সার্কাস ময়দানে একটি ধরনামঞ্চ তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে আন্দোলনকারীরা বলেন, একের পর এক নির্বাচন কমিশন যেভাবে খামখেয়ালিপনা করছে তাতে তাদের মনে হচ্ছে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে বেনাগরিক করার চক্রান্ত করা হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে এদেশে বসবাস করার পরেও সাধারণ মানুষকে হয়রান করা হচ্ছে। এর বৈধতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলছেন। এই বিষয়কে সামনে রেখে আগামী ২৭ তারিখ কলকাতা একটি বড় গণকনভেশন হতে চলেছে বলে জানান আন্দোলনকারীরা। পরের দিন ২৮ তারিখ পার্ক সার্কাস ময়দান থেকে একটি মিছিল নির্বাচন কমিশনের দফতর পর্যন্ত যাবে বলেও খবর পাওয়া গিয়েছে। সর্বোপরি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে চূড়ান্ত অব্যবস্থার অভিযোগ তুলছেন সাধারণ মানুষ। সংখ্যালঘু, দলিত এবং পিছিয়ে পড়া এলাকার মানুষের মধ্যে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ, বেছে বেছে সেইসমস্ত এলাকায় অধিকাংশ ভোটারকে বিবেচনাধীন করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। মঙ্গলবার যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে সে সমস্ত এলাকার ভোটারদের এখনও কোনও নাম সম্পূরক অর্থাৎ সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় প্রকাশিত হয়নি। স্বাভাবিকভাবে কবে প্রকাশিত হবে, তারা ভোট দিতে পারবেন কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তাই সাধারণ মানুষ নির্বাচন কমিশনের এই চূড়ান্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন।
(সৌজন্য- আপনজন)

0 Comments