বেঙ্গল মিরর ডেস্কঃ ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন বা ইউজিসি-র জারি করা নতুন বিধি ঘিরে দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের আবহে আপাতত সেই নিয়মাবলি কার্যকর করার উপর স্থগিতাদেশ দিল দেশের সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি, ওই বিধিগুলির প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে খতিয়ে দেখার কথাও স্পষ্ট করে জানাল শীর্ষ আদালত।বিজ্ঞপ্তি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত প্রশ্ন তোলেন, “স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কি আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যা জাতিভিত্তিক বিভাজনের পথে ফিরে যাচ্ছে? একটি জাতিহীন সমাজ গড়ে তোলার জন্য আমরা যা অর্জন করেছি, তা কি তবে নষ্ট হয়ে যাবে?”
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিভিত্তিক বৈষম্য রোধে সম্প্রতি ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসির নতুন নির্দেশিকা জারি করে। তা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিশেষ করে সাধারণ বা তথাকথিত ‘উচ্চবর্ণ’ শ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠী এই নিয়মকে একতরফা ও ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি করছে। ইউজিসি ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ‘ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন (প্রোমোশন অব ইক্যুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশনস) রেগুলেশনস, ২০২৬’। এর মাধ্যমে ২০১২ সালের জাতিভিত্তিক বৈষম্য বিরোধী নিয়ম সংশোধন করা হয়। নতুন নিয়মে ‘কাস্ট-বেসড ডিসক্রিমিনেশন’ বা জাতিভিত্তিক বৈষম্যকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এমন বৈষম্য হিসেবে, যা শুধুমাত্র তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি উপজাতি (এসটি) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) সদস্যদের বিরুদ্ধে করা হয়। অর্থাৎ সংজ্ঞার মধ্যেই সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকরা কার্যত বাদ পড়ছেন। এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈষম্য রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে হেল্পলাইন চালু করা, মনিটরিং ব্যবস্থা গঠন, নিয়মিত রিপোর্ট ইউজিসির কাছে পাঠানো ইত্যাদি। এই ব্যবস্থার দায়িত্ব সরাসরি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের উপর চাপানো হয়েছে। উপাচার্য, অধ্যক্ষদের ব্যক্তিগতভাবে নিয়ম মানার নিশ্চয়তা দিতে হবে। যদি কোনও প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশিকা না মানে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। যেমন, নতুন কোর্স অনুমোদন বন্ধ করা, ইউজিসির বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া বা এমনকী প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি প্রত্যাহার পর্যন্ত করা হতে পারে।
২০১২ সালের ইউজিসি অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন রেগুলেশন কার্যকরভাবে রূপায়ণ হচ্ছে না— এই অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন রাধিকা ভেমুলা এবং আবেদা সালিম তাদভি। রাধিকা ভেমুলা হলেন হায়দরাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির গবেষক রোহিত ভেমুলার মা। আর আবেদা তাদভি হলেন মুম্বইয়ের চিকিৎসক পড়ুয়া পায়েল তাদভির মা। রোহিত ও পায়েল দু’জনেই জাতিভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ইউজিসিকে নতুন, শক্তিশালী নিয়ম তৈরির নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মেনেই ইউজিসি ২০২৬ সালের নতুন ইক্যুইটি রেগুলেশন জারি করে। সমালোচকদের বক্তব্য, ইউজিসি যেভাবে ‘কাস্ট-বেসড ডিসক্রিমিনেশন’ সংজ্ঞায়িত করেছে, তাতে সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা পুরোপুরি সুরক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, বৈষম্য যে কোনও দিক থেকেই হতে পারে। কিন্তু নতুন নিয়মে শুধু সংরক্ষিত শ্রেণির মানুষদেরই ‘ভিকটিম’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। ফলে সাধারণ শ্রেণির কেউ যদি বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তাঁদের জন্য কোনও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির পথ থাকছে না। আরও অভিযোগ, এই নিয়মে ‘ভুল অভিযোগ’ বা মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে কোনও সুরক্ষা নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুরু থেকেই অপরাধী ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে, যা ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করবে।
এই বিতর্ক সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছতেই অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। আপাতত ইউজিসি-র নিয়মাবলি কার্যকর করার উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শুধু তাই নয়, এদিন র্যাগিং সংক্রান্ত প্রসঙ্গ টেনে প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, দেশের দক্ষিণ বা উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে পড়ুয়ারা নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে পড়তে আসে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই সংস্কৃতি সম্পর্কে অপরিচিতরা কটূক্তি করে। এখন আবার আলাদা হস্টেলের প্রস্তাব, “হে ভগবান”। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, আজকের সমাজে আন্তঃজাত বিয়েও হচ্ছে। তাঁর নিজের ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরাও হস্টেলে থেকেছি, যেখানে সবাই একসঙ্গেই থাকত।”
অন্যদিকে পিছিয়েপড়াদের বক্তব্য, নতুন নিয়মে পিছিয়েপড়া এসটি, এসসি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের সুরক্ষার কথা ছিল। কিন্তু ব্রাহ্মণ্য গোষ্ঠীর চাপে পড়ে বিষয়টা বানচাল হচ্ছে। অনেকের সোশ্যাল মিডিয়া লিখছেন, উচ্চবর্ণের মানুষ সমতায় বিশ্বাস করে না, তাই চাপ সৃষ্টি করছে যাতে নিয়মটি কার্যকর না হয়। এরই মধ্যে স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।

0 Comments