আসিফ রেজা আনসারী
বিহারের পর দেশজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবীড় সংশোধন বা এসআইআর করতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। এ নিয়ে বিরোধী দলগুলি প্রতিবাদে সরব হয়েছে। এরই মধ্যে এসআইআর’কে ঘুর পথে এনআরসি বলে অভিহিত করলেন প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দার। মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বেশকিছু মানবাধিকার সংগঠন। তাতেই উপস্থিত ছিলেন তিনি। হর্ষ মান্দার ছাড়াও সাংবাদিক সম্মেলনে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী নাদিম খান, মানজার জামিল, বন্দিমুক্তি কমিটির ছোটন দাস, কবি প্রসূণ ভৌমিক, রাজ্য জামাআতের সভাপতি ডা. মসিহুর রহমান, হকার নেতা মুরাদ হোসেন প্রমুখ।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত মানবাধিকারকর্মীরা।
হর্ষ মান্দার বলেন, নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে সরকার ঘুর পথে এনআরসি করতে চাইছে। বিরোধী দলগুলিকে জোরালো প্রতিবাদ করা উচিত। তাঁর মতে, গরিব বা প্রান্তিকশ্রেণির মানুষের কাছে কাগজ থাকবে না, তখন তাদের বিদেশি বলে তাড়ানোর চেষ্টা হবে। দেশজুড়ে বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারকে তিনি অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক বলেও অভিহিত করেন। ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিন্নতার মধ্যেই দেশের ঐক্য নিহিত আছে, তাহলে এমন বেছে বেছে ‘বাংলাদেশি’ খোঁজা হচ্ছে কেন? প্রশ্ন তোলেন হর্ষ মান্দার।
অন্যদিকে নাদিম খান আহমদাবাদ, পুনে, গুরুগাঁওয়ে বাঙালিদের আক্রান্ত হওয়ার বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য রাজ্যের তরফে যতটা সক্রিয় হওয়া দরকার, তা হচ্ছে না। এক শ্রমিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তিনি। অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরেন লাইভ-ফোনের মাধ্যমে। এছাড়া কবি প্রসূণ ভৌমিক বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, আরএসএস-বিজেপি বাঙালি বিদ্বেষী। তারা রাজনৈতিকভাবে না পেরে ধর্ম ও ভাষাকে ব্যবহার করে হিংসা ছড়াতে চাইছে। একই অভিযোগ করেন মুরাদ হোসেন। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালি শ্রমিকদের স্বার্থে পথে নেমে আন্দোলনের ডাক দেন। আর বিজেপি’র মেরুকরণের বিরুদ্ধে সরব হন ডা. মসিহুর রহমান। বাংলাভাষী মুসলিমদের বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বলে দাগিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেন মানজার জামিল।
অন্যদিকে এ দিনই সন্ধ্যায় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস সভাঘরে একটি গোলটেবিল বৈঠক হয়। সভায় মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দার বলেন, আরএসএস একশো বছর আগেই এর পরিকল্পনা করেছিল। তারা মুসলিমদের নাগরিক মনে করে না। সাম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার তারা মানে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশজুড়ে এসআইআর করার মাধ্যমে এনআরসি করার চেষ্টা হচ্ছে। এটাতেই থেমে থাকবে না, এরপর নতুন ইস্যু আসবে। অন্যদিকে বাংলাভাষীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নিয়েও তিনি উষ্মা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনের নেতা নাদিম খান বলেন, এসআইআর নিয়ে বিহারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মাত্র ২.৪ শতাংশ মানুষের কাছে জন্মসনদ, ২.৮ শতাংশ মানুষের কাছে পাসপোর্ট আছে, সেখানে বাকিরা নথি জোগাড় করবে কীভাবে? মানুষের নথি চাওয়ার মাধ্যমে হয়রান করা ও সন্দেহজনক ভোটার হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হচ্ছে। তাঁর আরও অভিযোগ, আগে ভোটাররা সরকারকে নির্বাচিত করত, এখন সরকার ঠিক করতে চাইছে কে ভোটার হবেন!
সমাজকর্মী রাজিবকান্তি রায় বলেন, সমাজের দূর্বলশ্রেণির মানুষকে টার্গেট করা হচ্ছে। পরিযায়ী ইস্যুতে বাংলার ধনসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদকে টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কবি প্রসূণ ভৌমিক। সবাইকে যৌথভাবে প্রতিবাদে নামতে হবে বলে উল্লেখ করেন শিখনেতা সরন সিং, শ্রমিকনেতা মুরাদ হোসেন, রাফে সিদ্দিকীরা।
অন্যদিকে আইনজীবী সামিম আহমেদ বলেন, পরিযায়ী ইস্যুতে যা হচ্ছে তা সংবিধানের উপর আঘাত। এসআইআর নিয়েও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। নেপাল সিং, ডা. মসিহুর রহমানরা অভিযোগ করেন, শুধু মুসলিমরা নয়, হিন্দুরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। ভিনরাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের উপর নির্যাতন ও এনআরসি’র নোটিশ নিয়ে বিজেপিকে কড়া আক্রমণ করেন ডা. মসিহুর রহমান। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লেখক আবদুল মোমেন, আইনজীবী আসফাক আহমেদ, ছোটন দাস, সাদাব মাসুম, মানজার জামিল প্রমুখ।
সভার শেষে ছোটন দাস ঘোষণা করেন, আগামীতে বড় নাগরিক কনভেনশন করা হবে। একইসঙ্গে নাগরিক সমাজের কাছে পথে নেমে প্রতিবাদের আহ্বান জানানো হবে। তৃণমূলস্তরে মানুষের কাছে এসআইআর নিয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরা হবে। দরকারে বিজেপি-বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে জোরালো প্রতিবাদে নামা হবে বলেও তিনি জানান।
0 Comments