ওয়াকফ আইন বদলাতে বিজেপির দোসর তৃণমূল? ইতিহাস খুঁচিয়ে কল্যাণ-ইস্যুতে সরব মুসলিম নেতারা

কৌশিক মিশ্র ও আসিফ রেজা আনসারী

পার্লামেন্টে বিভিন্ন বিল পাস করার ক্ষেত্রে তৃণমূল বা এই জাতীয় কিছু দল বিজেপির দোসর। বাইরে  প্রতিবাদ করলেও দেখা যাচ্ছে পার্লামেন্টে ভোটাভুটির সময় ওয়াক–আউট করে বিজেপিকেই সুবিধা করে দিচ্ছে তারা।  এবার ওয়াকফ আইন নিয়েও একই প্রশ্ন সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এবারও কি বিজেপি সফল হবে তৃণমূলের সৌজন্যে, নাকি ইন্ডিয়া–জোটের শক্তিশালী বিরোধিতায় আটকানো যাবে ক্ষতিকর আইন?  এ নিয়ে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন ও নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হয়। সবার মতামত তুলে ধরল বেঙ্গল মিরর।

ওয়াকফ ও তৃণমূলের ভূমিকা নিয়ে সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠকে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করেছেন, তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি সত্যি প্রতিবাদ করেছেন এবং এই প্রতিবাদ সর্বত্র জারি থাকা দরকার। তিনি আরও বলেন, বিগত দিনে আমরা দেখেছি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃণমূল ময়দানে না থেকে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সরে এসেছে। এবার যাতে সেটা না হয় তা দেখতে বলব। মাঠে কিংবা পার্লামেন্টে, সব ক্ষেত্রেই যাতে একই প্রতিবাদ জারি থাকে এবং শেষ পর্যন্ত যেন ময়দানের টিকে থাকে সে কথাও বলতে চাই না।


অন্যদিকে ওয়েলফেয়ার পার্টির নেতা ডা. রইসুদ্দিন বলেন, যখন কোনও মুসলিমদের বিষয় থাকে কিংবা পার্সোনাল ল'–এর বিষয় থাকে তখন তৃণমূল ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায়। এটা আমরা বরাবরই দেখে আসছি। এই বিষয়টাকে আমরা কোনভাবেই ভালো চোখে দেখছি না। যারা এ বিষয়টা নিয়ে ময়দানের লড়ছে কিংবা সত্যিকারের বিরোধিতা করতে চাইছে, তাদের একদিকে যেমন ময়দানে লড়তে হবে একইসঙ্গে পার্লামেন্টেও লড়তে হবে। পার্লামেন্টে তাদেরকে দাঁড়িয়ে থেকে লড়তে হবে ।


তিনি আরও বলেন, পার্লামেন্টের লড়াইয়ের সময় কিংবা ভোটাভুটির সময় তৃণমূল সেখান থেকে নিজেদেরকে  ওয়াক–আউট করে নেয়, এটা আমরা কোনদিন ভালো মনে দেখি না। তাদের কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে সেটা আমরা বলতে পারব না, তবে আমাদের মনে হয় আন্দোলন কিংবা এর বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষেত্রে তাদের উদ্যোগ বা ইচ্ছার অভাব রয়েছে। আমরা দাবি করব যারা সত্যি–সত্যি বিরোধিতা করছে তারা যেন লড়াইয়ের ময়দানে থাকে। একইসঙ্গে পার্লামেন্টে যেন জোরালো প্রতিবাদ বজায় থাকে।


এ দিকে এসডিপিআই–এর নেতা তায়েদুল ইসলাম বলেন, জেপিসি'র সভায় দু'জন সাংসদ যা দেখালেন তাতে দেশবাসী–সহ বিশ্ববাসী দেখলেন বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সাংসদদের মান কেমন! অনেকেই ভাবছেন গদি মিডিয়া প্রকৃত চিত্র আড়াল করছে। কারণ, দুই সাংসদই শাসকগোষ্ঠীর সদস্য। গ্লাসটি মদের ছিল। ওর ভাগ নিয়েই ঝগড়া ছিল। আমাদের মনে হয় এসব ছাড়াও তৃণমূল জেপিসি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এভাবে ঝামেলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসার অজুহাত তৈরি করতে চাইছে। শুধু এই ঘটনা নয়। এর আগেও এ রকম অনেক ঘটনা ঘটেছে। এ সব প্রমাণ করছে সাংসদদের শিক্ষা, রুচি, আচার–আচর, রাজনৈতিক শিক্ষা ক্রমশ নিম্নগামী। এর জন্য সব রাজনৈতিক দলই দায়ী। আর ওয়াকফ নিয়ে তৃণমূলের ভূমিকা এখনও স্পষ্ট নয়।


এ নিয়ে আইএসএফ বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকীর বক্তব্য, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিল পার্লামেন্ট থেকে যখন পাস হয়েছে, অধিকাংশ সময় দেখা গিয়েছে তৃণমূল ওখানে অনুপস্থিত ছিল বা ওয়াক-আউট করে ওখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। তৃণমূলের এমপিদের কাজ হচ্ছে ওখানে থেকে বিরোধিতা করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ না করে তারা এক প্রকার পেছনের দরজা দিয়ে বিজেপির বারবার সুবিধা করে দিয়ে আসছে। আমরা যদি দেখি তিন তালাক বিল, এনআরসির সিএএ যখন বিল পাস হয়েছিল, সেই ক্ষেত্রেও একই ভূমিকা পালন করেছে তৃণমূল। আমরা এক্ষেত্রে আশা করব তৃণমূল আর সেই ভুলটা আর করবে না। কারণ, পশ্চিমবাংলা-সহ সারা দেশের মুসলিমরা সজাগ সতর্ক হয়েছে। তৃণমূলের পারফরমেন্স জানতে পেরেছে। এবার যদি নাটক করে, তাহলে পশ্চিমবাংলার মুসলিমরা তৃণমূলকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আর ইন্ডিয়া জোটে আছে যেটা বলছেন, সেটা হচ্ছে তৃণমূল এখন নামকা-ওয়াস্তে ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে আছে। যদি বিজেপির কখনও তৃণমূলের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, তাহলে তারা দরাজ হস্তে বিজেপিকে সহযোগিতা করার জন্য  তৈরি। কারণ বিগত দিনে দেখেছি বিজেপি এবং তৃণমূল একসঙ্গে ঘর সংসার করেছে।


সমাজকর্মী ও আইনজীবী আনিসুর রহমান-এর বক্তব্য, আরএসএস -এর শতবর্ষে তাদের ঘোষিত ভারতবর্ষকে  তথাকথিত হিন্দুরাষ্ট্র বানাবার প্রচেষ্টার অঙ্গ হিসাবে মুসলিমদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ভয়ংকর হুমকি স্বরুপ ওয়াকফ বিল পার্লামেন্টে পেশ করেছে। জেপিসি-তে গেলেও ওয়াকফ বিল নিয়ে মুসলমানদের আশংকা ও উৎকন্ঠা শেষ হচ্ছে না। তার সর্বশেষ সংযোজন জেপিসি মিটিংয়ে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জির টেবিলে কাঁচের বোতল ঠুকে নিজের আঙুল কাটা ও অসংসদীয় কথাবার্তা বলে সাসপেন্ড হওয়া। তাই তিন তালাক বিল, ৩৭০ ধারা,  উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম শরীক তৃণমূল কংগ্রেস এবারও কি ওয়াক আউট করে বা অন্য কোন ছলে আরএসএস তথা বিজেপির এজেন্ডাকে পুরো করতে তৎপর হবে কিনা সেই আশংকা থেকে যাচ্ছে।

Post a Comment

0 Comments