এনজিও-র মানবিক কেন্দ্র কি হারিয়ে যাচ্ছে?

ড. শতদ্রু চট্টোপাধ্যায়


পরিবর্তনটা আমি একদিনে বুঝিনি। সেটা এসেছে ধীরে ধীরে, তারপর ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। মিটিংয়ের ভাষা বদলেছে, প্রজেক্ট প্রপোজালের সুর বদলেছে, ডোনার কলের অগ্রাধিকার বদলেছে। সংহতি, অধিকার ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার জায়গা ক্রমে ছেড়ে দিয়েছে স্কেল, অপ্টিমাইজেশন, টেকনিক্যাল ডেলিভারি আর মেজারেবল আউটকামের ভাষাকে। এনজিও জগতে নেতৃত্বের ভূমিকায় পঁচিশ বছর কাটিয়ে আমি দেখেছি, কেউ ঘোষণা দিয়ে বলেনি যে এক যুগ শেষ হয়ে আরেক যুগ শুরু হলো। পরিবর্তনটা এসেছে চুপচাপ, যেন সেটাই ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক পথ।

একসময় এনজিও মানেই ছিল বিতর্ক, প্রশ্ন, মতভেদ। প্রতিষ্ঠানগুলো খুব গোছানো ছিল না, সবসময় খুব কার্যকরও ছিল না, কিন্তু সেখানে তর্ক ছিল, নৈতিক অস্বস্তি ছিল, রাজনৈতিক কৌতূহল ছিল। আমরা জমি, শ্রম, বৈষম্য, বঞ্চনা, নারী-পুরুষের ক্ষমতার সম্পর্ক, রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতাম। আমরা শুধু দরিদ্রতা কমানোর উপায় খুঁজতাম না; আমরা জানতে চাইতাম, দরিদ্রতা কেন টিকে থাকে, কারা এর থেকে লাভবান হয়, কোন কাঠামো মানুষকে বারবার পিছিয়ে দেয়। উন্নয়ন তখন শুধু সিস্টেমকে একটু ভালো করে চালানোর প্রকল্প ছিল না। এটি ছিল অন্যায্য ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক ধরনের নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রয়াস।

বিজ্ঞান অবশ্যই তখনও ছিল, এখনো আছে। কৃষিবিজ্ঞান দরকার ছিল, জলবিদ্যা দরকার ছিল, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, জনস্বাস্থ্য ও পরিসংখ্যানও দরকার ছিল। কোনো যুক্তিবাদী মানুষই এগুলোর প্রয়োজন অস্বীকার করবেন না। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় যা বদলেছে, তা বিজ্ঞান এসেছে বলে নয়; বরং বিজ্ঞানকে একটি উপকরণ থেকে ধীরে ধীরে একটি চালিকাশক্তিতে পরিণত করা হয়েছে। টেকনিক্যাল জ্ঞান আর কেবল বড় সামাজিক লক্ষ্যকে সহায়তা করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না; অনেক ক্ষেত্রে সেটাই এখন এজেন্ডা ঠিক করছে। আজকের উন্নয়ন জগতে ডেটা, মেট্রিক্স, মডেলিং, ডিজিটাল ম্যাপিং, ইমপ্যাক্ট অ্যানালিটিক্স, এগ্রোনমি, ক্লাইমেট মডেলিং এবং সিস্টেম ডিজাইন ক্রমে কেন্দ্রে চলে এসেছে। ভাষাও বদলেছে। সংহতির জায়গায় এসেছে স্কেল, সঙ্গে থাকার জায়গায় ডেলিভারি, রাজনৈতিক শিক্ষার জায়গায় ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, আর জনঅংশগ্রহণকে নরম করে বলা হচ্ছে স্টেকহোল্ডার এনগেজমেন্ট।

এই পরিবর্তন হঠাৎ আসেনি। উন্নয়নের দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যেই এর বীজ ছিল। যুদ্ধোত্তর সময়ে উন্নয়নচিন্তা, তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, জাতীয় রূপান্তর, প্রতিষ্ঠান গঠন এবং জনস্বার্থের কথা বলত। পরে নির্ভরতা তত্ত্ব, বৈষম্যমূলক বিনিময় ও কাঠামোগত বঞ্চনার সমালোচনা সেই আলোচনাকে ক্ষমতা ও রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়। তারপর আসে স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট, গভর্ন্যান্স রিফর্ম, পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট এবং ম্যানেজারিয়াল দক্ষতার যুগ। এখন আমরা যেন সেই ধারারই আরেক ধাপে এসে পৌঁছেছি, যেখানে উন্নয়নকে ক্রমশ টেকনিক্যাল সিস্টেম, মেজারেবল ইন্ডিকেটর এবং অপ্টিমাইজড ইন্টারভেনশনের ভাষায় চালানো হচ্ছে।

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। এনজিওগুলো এই পরিবর্তনের বাইরে দাঁড়িয়ে নেই। তারা এর ভেতরেই আছে। OECD-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর কাছে বা তাদের মাধ্যমে যাওয়া সহায়তার পরিমাণ ছিল ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দ্বিপাক্ষিক সরকারি উন্নয়ন সহায়তার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। এর অর্থ, এনজিও এখন উন্নয়ন যন্ত্রের প্রান্তিক দর্শক নয়; বরং তার বড় একটি ডেলিভারি বাহু। ফলে এই খাতে লেজিবল, ম্যানেজেবল, টেকনিক্যালি দক্ষ এবং ডোনার-ফ্রেন্ডলি হয়ে ওঠার চাপ এত প্রবল হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ওপাশ থেকেও এই পরিবর্তনকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আজকের অনেক ডোনার এমন কাজ পছন্দ করেন, যা স্ট্যান্ডার্ডাইজ করা যায়, বেঞ্চমার্ক করা যায়, দ্রুত রিপোর্ট করা যায় এবং “ইনোভেশন” নামে প্যাকেজ করা যায়। তাছাড়া সহায়তার পরিমাণ যখন কমে আসে, তখন এই ঝোঁক আরও বাড়ে। OECD ২০২৪ সালে সরকারি উন্নয়ন সহায়তায় ৯ শতাংশ পতনের পর ২০২৫ সালে আরও ৯ থেকে ১৭ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। এই বাস্তবতায় ধীর, জটিল, রাজনৈতিক কাজের কদর কমে যায়, কারণ সেটিকে দ্রুত মাপা যায় না। তখন আদর্শ এনজিওকর্মী আর সেই সংগঠক নন, যিনি কঠিন প্রশ্ন তোলেন। বরং তিনি সেই টেকনিক্যাল ম্যানেজার, যিনি কনসালটেন্সির গতিতে, কিন্তু নন-প্রফিট খরচে, একটি সল্যুশন ডেলিভার করতে পারেন।

এখানেই আমি যে নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠানের উত্থান দেখেছি, তাদের বলা যেতে পারে “টেকনোক্র্যাটিক এনজিও”। তারা এখনো অধিকার, ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি, অংশগ্রহণের ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু তাদের কাজের গতি, প্রণোদনা, নিজেকে উপস্থাপনের ভঙ্গি এবং অগ্রাধিকার ক্রমেই টেকনিক্যাল কন্ট্রাক্টর বা কনসালটেন্সি ফার্মের মতো হয়ে উঠছে। তারা ন্যায়ের কথা বলে, কিন্তু বারবার সেই ভাষাকে ডেলিভারির নিচে নামিয়ে আনে। তারা প্রশ্ন তোলে কম, সমাধান দেয় বেশি। তারা বোঝার চেয়ে ম্যানেজ করতে বেশি স্বচ্ছন্দ। কেন বঞ্চনা তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের চেয়ে কীভাবে একটি ইন্টারভেনশন আরও কার্যকর করা যায়, সেটাই তাদের কাছে বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।

রাজনীতিও এই রূপান্তরে বড় ভূমিকা রেখেছে। আজ অনেক সরকার ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এমন এনজিওকে স্বাগত জানায়, যারা জলবায়ু-সহনশীল বীজ সরবরাহ করে, কৃষকদের জন্য মোবাইলভিত্তিক পরামর্শসেবা চালু করে, সেচব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ায়, অথবা বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও সহজ করে দেয়। কাজগুলো নিজের মধ্যে খারাপ নয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয়, যখন এগুলোই পুরো আলোচনার জায়গা দখল করে নেয়। পানি কার নিয়ন্ত্রণে, জমির মালিকানা কার হাতে, কার শ্রম অদৃশ্য হয়ে থাকে, কার জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, সেই প্রশ্নগুলো পিছিয়ে যায়। এনজিওকে গ্রহণ করা হয় যতক্ষণ সে সল্যুশন দেয়। কিন্তু সে যদি কারণ নিয়ে কথা বলে, ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে কথা বলে, তখনই সে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতায় একটি পুরো সাপোর্টিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে, যারা বাণিজ্যিক বিস্তারকে উন্নয়নের নরম ভাষায় সাজিয়ে তোলে। দরিদ্র মানুষের কাছে আরও পণ্য বিক্রি করাকে বলা হয় এমপাওয়ারমেন্ট। সাপ্লাই চেইনের ওপর কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণকে বলা হয় ইনক্লুশন। কেনা ইনপুটের ওপর নির্ভরতাকে বলা হয় রেজিলিয়েন্স। সব ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ যে খারাপ, তা নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, ভাষা যত উষ্ণ হয়, নিচের মডেল তত বাণিজ্যিক হয়ে ওঠে। বড় ফিলানথ্রপিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেও একই প্রবণতা দেখা যায়। গেটস ফাউন্ডেশন ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে শুধু এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্টেই ৫৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ৩১ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ এই টেকনিক্যাল টার্ন কোনো কল্পিত অনুভূতি নয়। এটিকে বাস্তবে অর্থায়ন করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে কার্বন ক্রেডিট ও কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশনের প্রশ্নে। অনেক জায়গায় এখন এগুলোই উন্নয়নের নতুন মাস্টার ভাষা হয়ে উঠছে। কারণ কার্বনকে মাপা যায়, কেনাবেচা করা যায়, এবং ডোনারদের কাছে সহজে উপস্থাপন করা যায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি কার্বন প্রাইসিং এখন বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ২৮ শতাংশকে কভার করছে, আর ২০২৪ সালে ব্যবহার না হওয়া কার্বন ক্রেডিটের মজুত প্রায় ১ বিলিয়ন টনে পৌঁছেছিল। একই সময়ে ভলান্টারি কার্বন মার্কেটে ১৮২ মিলিয়ন টন ক্রেডিট অবসায়িত হয়েছে। জলবায়ু সংকট বাস্তব, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু উদ্বেগের জায়গা হলো, কী দ্রুততায় ভূমি, বন, কৃষি ও জীবিকাকে নতুন করে “কার্বন অপারচুনিটি” হিসেবে দেখা হচ্ছে, এবং কী দ্রুততায় এনজিওগুলোও সেই অর্থায়নের লাইনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব এনজিওর ভেতরের সংস্কৃতিতেও পড়েছে। মাঠে থাকা, ধৈর্য নিয়ে শোনা, ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা, এসব দক্ষতা আগের মতো মূল্য পায় না। তার জায়গায় এসেছে প্রজেক্ট আর্কিটেকচার, রিপোর্টিং সিস্টেম, ড্যাশবোর্ড, কমপ্লায়েন্স, প্রোকিউরমেন্ট ডিসিপ্লিন এবং ইনোভেশন-দেখানো এক ধরনের পেশাদার ভঙ্গি। কর্মীরা ক্রমে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি, এগ্রি-বিজনেস ফার্ম বা সাসটেইনেবিলিটি কনসালটেন্সির পেশাজীবীদের মতো হয়ে উঠছেন। তাদের কাজের ছন্দ, প্রণোদনা, উৎকণ্ঠা, সফলতার সংজ্ঞা, সবই কাছাকাছি চলে এসেছে। একসময় মনে হয়, এনজিওতে কাজ করা আর কোনো ফার্ম কেমিক্যাল কোম্পানি, ইনপুট সাপ্লায়ার বা কনসালটেন্সি ফার্মে কাজ করার পার্থক্যটা উদ্দেশ্যের চেয়ে ব্র্যান্ডিংয়ের মধ্যে বেশি রয়ে গেছে।

এর ফলও আছে। যখন টেকনিক্যাল দক্ষতাই সবচেয়ে বড় মুদ্রা হয়ে ওঠে, তখন মানুষের জীবনকে বোঝার ধীর কাজটাকে তুচ্ছ মনে হতে শুরু করে। কিন্তু দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জীবন আলাদা আলাদা খোপে ভাগ করা নয়। একজন ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য পানি আলাদা কোনো বিষয় নয়; সেটি ঋণের সঙ্গে জড়িত। মাটি জমির অধিকারের সঙ্গে জড়িত। বীজ দেনার সঙ্গে জড়িত। জলবায়ু জড়িয়ে আছে অভিবাসন, ক্ষমতা আর টিকে থাকার প্রশ্নের সঙ্গে। এনজিও যখন এই বাস্তবতাকে শুধু টেকনিক্যাল লেন্সে দেখে, তখন মানুষকে সে কণ্ঠস্বর, স্মৃতি ও দাবিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে কম, আর ম্যানেজ করার কেস হিসেবে বেশি দেখতে শুরু করে। কৃষক তখন ড্যাশবোর্ডের একটি সংখ্যা, তালিকার একজন বেনিফিশিয়ারি, কোনো পণ্যের কাস্টমার, কিংবা সাপ্লাই চেইনের আরেকটি লিংক। মানুষটি নিজে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।

তবু আমার মনে হয়, এই পথেই এনজিও জগতকে শেষ পর্যন্ত যেতে হবে, এমন নয়। এনজিও জগত যদি তার মানবিক কেন্দ্রটি আবার ফিরে পেতে চায়, তবে তাকে ব্যবসার একটি উপশাখা বা কনসালটেন্সি ইন্ডাস্ট্রির সস্তা বাহু হয়ে যাওয়ার প্রলোভন ঠেকাতে হবে। এর মানে বিজ্ঞানকে বাদ দেওয়া নয়, পার্টনারশিপকে অস্বীকার করা নয়, পেশাদারিত্বকে অবজ্ঞা করা নয়। এর মানে হলো, এগুলোকে আবার তাদের সঠিক জায়গায় বসানো। টেকনিক্যাল দক্ষতা হবে মাধ্যম, লক্ষ্য নয়। উন্নয়নকে আবার এমন সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠান ও জোটের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যারা এখনো ন্যায়, শ্রম, জমি, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বড় প্রশ্নগুলো তোলে।

সম্ভবত এখানেই নতুন পথের শুরু। এনজিওগুলোকে আবার শ্রমিক সংগঠন, ধর্মভিত্তিক সংগঠন, তৃণমূলের দল এবং এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি যেতে হবে, যারা শুধু নাম কামানো নয়, সামাজিক দায়ও নিতে প্রস্তুত। দরকার কম সাফল্য-দেখানো স্লোগান, বেশি নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। দরকার কম লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক, বেশি দীর্ঘস্থায়ী জনভিত্তি। তা না হলে এনজিও আরও দক্ষ হবে, কিন্তু আরও কম স্বতন্ত্র হয়ে উঠবে। আর যদি তারা এই ভিত ফিরে পায়, তবে হয়তো কারিগরি জ্ঞান ব্যবহার করেও তাদের কাজের গভীর উদ্দেশ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে।

আমি এই কথা নস্টালজিয়া থেকে বলছি না। এনজিও কখনোই নিষ্পাপ ছিল না। তারা সবসময়ই ডোনারের অগ্রাধিকার, এলিট পছন্দ এবং উন্নয়নচিন্তার চলতি ফ্যাশনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। আমি বিজ্ঞানবিরোধীও নই। বরং এই সময় আমাদের আরও বেশি বৈজ্ঞানিক সততা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত চাপ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই কঠোর জ্ঞান দরকার। আমার উদ্বেগ অন্য জায়গায়। যখন বিজ্ঞান সামাজিক বোঝাপড়া থেকে আলাদা হয়ে যায়, আর টেকনিক্যাল দক্ষতা রাজনৈতিক সাহসকে সরিয়ে দেয়, তখন উন্নয়ন তার মানবিক কেন্দ্র হারাতে শুরু করে।

আমার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এই নয় যে এনজিওগুলো এখন বেশি দক্ষ। দক্ষতা ভালো। দুশ্চিন্তা হলো, তাদের অনেককে এখন সেই ব্যবস্থার আদলে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাকে একসময় তারা প্রশ্ন করার জন্য ছিল। এই ধারা যদি চলতেই থাকে, তাহলে উন্নয়ন খাত হয়তো আরও সল্যুশন দেবে, হয়তো আরও সুন্দর প্রেজেন্টেশনও দেবে। কিন্তু কার স্বার্থে সেই সল্যুশন, কীকে তা নীরব করে দেয়, আর শেষ পর্যন্ত এর খরচ কে বহন করে, সেই প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা ক্রমে হারাবে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু ক্ষুদ্র কৃষক, বঞ্চিত মানুষ বা অনিরাপদ শ্রমজীবী নয়। ক্ষতিগ্রস্ত হবে এনজিও ধারণাটিই।

(মতামত লেখকের নিজস্ব।  ভিন্নমত থাকলে আপনিও লিখুন।  আমরা প্রকাশ করব। )

Post a Comment

0 Comments