এসআইআর বাতিলের দাবিতে আম্বেদকর জয়ন্তীতে মহাসমাবেশের ডাক

শান্তনু দত্ত

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর বাতিলের দাবিতে ৪০ দিন ধরে আন্দোলন চলছে। পার্ক সার্কাস ময়দানে ধরনামঞ্চ হয়েছে। বেশ কিছু মিছিল হয়েছে, এবার মহাসমাবেশ করা হবে কলকাতায়। আগামী ১৪ এপ্রিল আম্বেদকরের জন্মদিন উপলক্ষে এই সমাবেশ হবে ধর্মতলায়। সেদিন দুপুরে সবাই নিজেদের আওয়াজ জোরালো করবে। এ নিয়েই রবিবার এক সাংবাদিক সম্মেলন হয় পার্ক সার্কাস ময়দানের ধরনামঞ্চে। এই সাংবাদিক সম্মেলন থেকে আগামীর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় এবং ডিলিটেড ভোটারদের কথাও তুলে ধরা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চের পক্ষে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল্লাহ, অধ্যাপক সাইদ-উল- ইসলাম, কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী আসিফ রেজা আনসারী, সমাজকর্মী কমল সুর, ঝিলম, সাজিদুর রহমান, জিসান, পাশারুল আলম, আব্দুল হাদি, সাইন শেখ প্রমুখ। ডিলিটেড ভোটার হিসাবে নিজেদের কথা তুলে ধরেন সন্দীপ আহমেদ, অধ্যাপিকা নন্দিতা রায়, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা মিলিসা খাতুন, অধ্যাপক শামীম আখতার, ফরিদুল ইসলাম প্রমুখ। কিভাবে ভোটার লিস্ট থেকে নাম মুছে দেওয়া হয়েছে সেই কথা তারা তুলে ধরেন। নথিপত্র থাকার পরেও যেভাবে নাম মুছে ফেলা হয়েছে, যাদের কাগজ নেই তাদের কী হবে প্রশ্ন তোলেন মিলিসা খাতুন। নোটিশ না পেয়ে একপ্রকার জোর করে নাম মুখে ফেলার অভিযোগ করেন নন্দিতা রায়।

এই সাংবাদিক সম্মেলনে আগামীর আন্দোলন নিয়ে উদ্যোক্তারা বলেন, ৪ঠা মার্চ থেকে চলা ভোটাধিকার রক্ষামঞ্চের এসআইআর বিরোধী ধরনার আজ ৪০ দিন পূর্ণ হল। আজকের এই প্রেস কনফারেন্স আসলে বাতিল মানুষদের প্রেস কনফারেন্স। এখানে যাঁরা আছেন ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র’ তাঁদের বাতিল ঘোষণা করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দেশে বসবাস করে, এই দেশে শ্রম দিয়েও আজ আমাদের সেই শ্রম, সেই স্মৃতি, সেই ইতিহাস, সেই অস্তিত্বকেই মুছে দিতে চাইছে রাষ্ট্র। অথচ আমরা কেউই এখনও জানিনা আমাদের নাম কেন বাদ দেওয়া হল। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছি যাঁরা সমস্ত রকম কাগজ, সমস্ত নথি জমা দেওয়ার পরেও আজ বেনাগরিক হতে চলেছি। আবার অনেকেই আছি যাঁদের কাছে যে তেরোটি নথি চাওয়া হয়েছে তার একটিও নেই। নেই কারণ, যে যে নথি চাওয়া হয়েছে তা এদেশের অধিকাংশ খেটে খাওয়া মানুষের কাছেই থাকা সম্ভব নয়। আজ আমরা তাই আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে, আমাদের ইতিহাস নিয়ে, আমাদের এতদিনকার যাপনযাত্রা নিয়ে। কারণ আমরা মনে করি আমাদের এই অস্তিত্ব, আমাদের এই ইতিহাস, আমাদের এই যাপনযাত্রাই আমাদের নাগরিকত্বের সব চেয়ে বড় প্রমাণ।

অধ্যাপক সাইফুল্লাহ বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু থেকেই আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের শ্রমকেই অস্বীকার করে আমাদের কাগজের বান্ডিলে পরিণত করা হয়েছে। আমরা অনেকেই লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে শুনানিতে ডাক পেয়েছিলাম। যে চিঠিগুলো আমাদের সেই সময়ে ধরানো হয়েছিল সেইগুলির বয়ান অত্যন্ত অবমাননাকর ছিল। কখনও বলা হয়েছিল ৬জনের বেশি মানুষ আমার বাবাকে বাবা হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। কখনও বলা হয়েছে আমার মায়ের সাথে আমার কিংবা আমার দিদার সাথে আমার বয়সের ফারাক কম বা বেশি। তাঁর প্রশ্ন, আমাদের দেশে কোন আইনে বলা আছে যে ছয়জনের বেশি সন্তান থাকা অপরাধ? কোন আইন বলে দেয় মায়ের সাথে মেয়ের বয়সের ফারাক ঠিক কতখানি হওয়া উচিত? আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক করে দেবে আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের শ্রম, আমাদের ইতিহাস বৈধ না অবৈধ? দীর্ঘ চারমাস ধরে আমরা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে বেড়াচ্ছি। আজ আবারও বলা হচ্ছে ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আবারও আমাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে। অথচ যখন আমরা অ্যাপিল করতে যাচ্ছি সেখানে কাগজ আপলোড করার কোনো জায়গা নেই। অ্যাপিল করতে সেখানে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র  ১০০০ ক্যারেক্টার অর্থাৎ ১৫০-১৬০ শব্দ। আমাদের এতদিনকার অস্তিত্বকে আজ প্রমাণ করতে হবে শুধুমাত্র ১৫০-১৬০ শব্দে! আবার আমরা জানি সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে যে আধার কার্ডের সাথে ফোন নম্বর লিংক করা বাধ্যতামূলক নয়, যেকোনো মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। অথচ, অনলাইনে অ্যাপিল করতে হলে ওটিপি একমাত্র আধারের সাথে ফোন নম্বর লিংক থাকলেই আসবে! এ কেমন দ্বিচারিতা? অফলাইনে অ্যাপিল করতে গেলে তো বেশিরভাগ জায়গাতেই একটা কাগজ ফেলার বাক্স রেখে দিয়ে দায় সেরেছে প্রশাসন। সেখানে আমাদের কাগজ আদৌ উপযুক্ত দফতরে পৌঁছালো না আস্তাকুড়ে গেল জানার উপায় নেই। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে আদৌ কোনো ন্যায্য শুনানি হবে তার কি গ্যারান্টি আছে?

আইনজীবী আসিফ রেজা আনসারী বলেন, অনেককেই বলা হচ্ছে ফর্ম ৬ এ আবেদন করতে কিন্তু পরিষ্কার বলা আছে ফর্ম ৬ শুধুমাত্র নতুন ভোটারের জন্য। এই ফর্মে আবেদন করতে হলে আমাদের মিথ্যে ঘোষণা করতে হবে যে আমি ভারতে কোনোদিন ভোট দিইনি। আমাদের ভোট দেওয়ার সমস্ত ইতিহাস মুছে যাবে। আমাদের এতদিনের অস্তিত্ব অবৈধ হয়ে যাবে। সরকারি নথিতে মিথ্যে বলা আইনত অপরাধ। জেল-জরিমানা হতে পারে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মানুষকে আরও বিপদে ফেলতে চাইছে। ট্রাইবুনালে গেলেও বহু প্রান্তিক-মানুষ ভোটাধিকার পাবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অধ্যাপক সাইদ-উল- ইসলাম বলেন, ৯১ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়ে কোনও গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতে পারে না। ৯১ লক্ষ মানুষ নিজের মতদান করতে সক্ষম না হলে সেই নির্বাচন জনগণের মতদানের প্রতিফলন হয় না। তাই আন্দোলনই পথ বলে তিনি জানান। একই কথা বলেন সাজিদুর রহমান।  রাস্তার আন্দোলনকে জোরদার করার কথা বলেন পাশারুল আলম, আব্দুল হাদি প্রমুখ।

আগামীর কর্মূসূচি নিয়ে আন্দোলোনকারীরা জানান, আগামী ১৪ই মার্চ বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের জন্মদিন। ওইদিন ধর্মতলায় বেলা ১২টায় মেট্রো চ্যানেলে একটি মহাসমাবেশ হবে। আমাদের মতোই আমাদের আরও সহনাগরিক যাঁরা বাদ পড়েছেন তাঁদের সবাইকে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, এই সমাবেশে যোগ দিন। আমাদের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার হরণ আমরা মেনে নেব না। কোনও মানুষ বেআইনি নয়, কোনও মানুষ বেনাগরিক নয়। আমাদের ধর্ম, আমাদের জাত, আমাদের লিঙ্গ নয়, আমাদের শ্রম, আমাদের ইতিহাস, আমাদের স্মৃতি, আমাদের জীবনই আমাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ। আন্দোলনকারীদের দাবি, অবিলম্বে এসআইআর বাতিল করো, ২০২৫ এর ভোটার তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন করো, এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করো, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে  নাগরিকত্ব আইনের এমন সমস্ত সংশোধন বাতিল করো।

Post a Comment

0 Comments