বেঙ্গল মিরর ডেস্কঃ ২০২৫-এর সোহারাব হোসেন স্মৃতি সম্মাননা গ্রহণ করলেন বিশিষ্ট কথাশিল্পী সুকান্তি দত্ত। ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, বিকেল তিনটেয় কলকাতার উপকণ্ঠে নব বারাকপুর প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী মালবিকা চক্রবর্তীর উদ্বোধনী বাউলগানের পর স্বাগত ভাষণ দেন নব বারাকপুর প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ড. সুনীল কুমার বিশ্বাস। সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায়। বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট অতিথি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আমিনা খাতুন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ড. বরেন্দু মণ্ডল।
স্বাগত ভাষণে অধ্যক্ষ ড. বিশ্বাস বলেন, যশস্বী কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ড. সোহারাব হোসেন আমাদের কলেজে একবার এসেছিলেন। উপলক্ষ্য ছিল আমাদের কলেজের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের সেমিনার। বক্তব্যে এবং ব্যবহারে আমরা সবাই মোহিত হয়েছিলাম। আর এবছর আমাদের হীরক জয়ন্তী। বেঁচে থাকলে ওঁকে আবার আমরা আমন্ত্রণ জানাতাম। কিন্তু সেটা তো আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়! আমাদের আরেকটা প্রাপ্তি, এবার যিনি এই পুরস্কার পাচ্ছেন, সেই কথাশিল্পী সুকান্তি দত্তের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই নব বারাকপুরেই।
অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা অনুযায়ী ড. খাতুন আলোচনা করেন সোহারাব হোসেনের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে। তিনি বলেন, এমন ছাত্রদরদী অধ্যাপক চিরকাল বিরল। এই দরদ সোহারাব পেয়েছিলেন ওঁর বেড়ে ওঠা জীবনের দারিদ্র্য ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে। সেই অভিজ্ঞতাই ধরা পড়েছে ওঁর লেখায়। সরম আলির ভুবন ইত্যাদি উপন্যাসে বসিরহাট অঞ্চলকে বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রে যে গৌরব উনি দিয়েছেন তার তুলনা নেই। তবে শুধু বসিরহাট নয়, সুন্দরবন, পুরুলিয়া, কলকাতা-বারাসাতের নগরজীবনেরও এক স্বতন্ত্র দর্পণ ওঁর লেখা। মহারণ, মাঠ জাদু জানে ইত্যাদি উপন্যাসে আছে নতুন দর্শন, নতুন শৈলী। তার উপরে তিনি ছিলেন যথার্থই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট ও নেতাদের বহুরূপী চরিত্র নিয়ে যেসব ছবি তিনি এঁকেছিলেন কুড়ি বছর আগে 'রাজার অসুখে', তা যেন এই এখনকার, এই মুহূ্র্তের কথা।
![]() |
| মানপত্র প্রদান |
অধ্যাপক ড. মণ্ডল বলেন, নিউ ব্যারাকপুর শহরের ইতিহাস আর সুকান্তিদার বেড়ে ওঠা সমান্তরাল। তবে তিনি যখন লিখতে শুরু করেছিলেন, সেই নব্বই দশকে, এতদিনের চেনা পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। সেই সঙ্কটের, পটপরিবর্তনের চলচ্চিত্র ওঁর কথাসাহিত্য। সুকান্তি কীভাবে এই সঙ্কটের মোকাবিলা করেছেন, কীভাবে ওঁর শৈলীতে সমন্বয় ঘটেছে চেতনাপ্রবাহরীতি ও সঙ্গীতের, কোন গুণে ওঁর পরিবেশচেতনা নিয়ে লেখা যুধান কথা বা অংশুমানের গঙ্গা অনন্য, সেসবের বিশ্লেষণে যে বৈদগ্ধ্যের পরিচয় দেন ড. মণ্ডল তা বহুদিন মনে রাখার মতো।
মাঝখানে মঞ্চে ওঠেন সঙ্গীতে নিবেদিত প্রাণ শর্মিষ্ঠা সাহা। ওঁর গাওয়া 'আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে' শুনে আক্ষরিক অর্থেই চোখে জল আসে শ্রোতাদের। মানপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দাস। সুকান্তি দত্তের হাতে সম্মাননা-স্মারক তুলে দেন সভামুখ্য সাধন চট্টোপাধ্যায় ও অধ্যক্ষ ড. সুনীল কুমার বিশ্বাস।
প্রতিক্রিয়ায় সুকান্তি দত্ত উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, সোহারাব এবং আমার জন্ম একই জেলায় এবং বেড়ে ওঠা একই সময়ে হলেও আমাদের দুজনের পারিবারিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বৃত্ত আলাদা। যদিও বন্ধুত্ব ছিল আমৃত্যু, তবু স্বতন্ত্র আমাদের রচনারীতি। তবে মিল ছিল এক জায়গায়। আমরা নিছক মনোরঞ্জনের জন্য লিখিনি।কোনো বৃহৎ পুঁজিশাসিত মিডিয়ার ন্যারেটিভকে পাত্তা দিইনি, বরং আমাদের অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা ও ভাবনা দিয়ে সেই ন্যারেটিভের উল্টো স্রোতে হেঁটেছি। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সোহারাবের গল্প-উপন্যাস নিয়ে বলেন, আজকের এই সভা, এই সম্মাননা অনুষ্ঠান প্রকৃত সার্থক হবে যদি আমরা আরও বেশি মানুষের কাছে সোহারাবের ভাবনা, সোহারাবের সাহিত্যকে পৌঁছে দিই।
সভাপতির অভিভাষণে সাধন চট্টোপাধ্যায় প্রথমে তাঁর দুটি স্মৃতি তুলে ধরেন। একটি সোহারাবকে নিয়ে, আরেকটি সুকান্তিকে নিয়ে। দুটোই এই দুই মহান কথাসাহিত্যিকের শুরুর দিকের দুটো লেখা প্রসঙ্গে। বলেন, আজকের 'আমার যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে' গানটা এইসব স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর রবীন্দ্রনাথের আমার চেতনায় পান্না হল সবুজ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন আজকালকার পুরস্কার দেওয়ার রীতি রেওয়াজ। এই স্মৃতি রক্ষা কমিটি সেদিক থেকে স্বতন্ত্র। তিনি আরও বলেন, আপনারা এই পুরস্কারকে ফ্রান্সের গোঁকুর পুরস্কারের মতো মর্যাদায় নিয়ে যেতে পারবেন আশা করি, যে পুরস্কার পেলে প্রাপক ধন্য হবেন এবং সবাই বলবেন একটা যথাযথ জায়গায় একটা যথাযথ পুরস্কার গেল। আর এই মহাবিদ্যালয়ের প্রশংসা করেন যে এমন একটা অনুষ্ঠানের জন্য তাঁরা জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। আজকের সভা যে পরিবেশ তৈরি করল সেটাই তিনি সারাজীবন আশা করে এসেছেন। আর সুকান্ত ভট্টাচার্য, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমেন চন্দ, যারা খুব অল্প বয়সে চলে গেছেন অমর সৃষ্টি রেখে, সেই সারিতে সোহারাব হোসেন যুক্ত হয়েছে।
শেষে নজরুলগীতি পরিবেশন করেন অধ্যাপক ড. বর্ণিনী মুখোপাধ্যায়। গত বছরের মতো এবারেও সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট রেডিও জকি কল্পলাল মজুমদার। তারিফ করার মতো তাঁর উপস্থাপন।অনবদ্য, মনোমুগ্ধকর কণ্ঠ। মঞ্চের উল্টোদিকেও ছিল চাঁদের হাট-- নীললোহিত পত্রিকার সম্পাদক কবি ও কথাকার বাসব দাশগুপ্ত, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শরদিন্দু সাহা, কবি ও কথাকার রক্তিম ইসলাম, তরুণ ঔপন্যাসিক ইসমাইল দরবেশ, 'কথাচর্চা'র আইজাক সাহা, লেখক রণবীর পুরকায়স্থ, প্রাবন্ধিক শিশির মল্লিক, লেখক অমিতাভ সরকার, বিশিষ্ট কবি ও ছড়াকার এম. আলাউদ্দিন খান, কবি আলমগীর রহমান, কবি আব্দুল মান্নান চৌধুরী, কবি সুদীপ দাস, নগরের কথার প্রখ্যাত সম্পাদক ব্যোমকেশ মজুমদার। ছিলেন সোহারাব-পত্নী মুনিয়া বারী, পুত্র সোহম হোসেন, জীবিতকালে সোহারাবের সর্বক্ষণের সঙ্গী দেবাশীষ কুণ্ডু, সুকান্তি দত্তের পত্নী কস্তুরী দত্ত, বউমা দিশা দত্ত মজুমদার, অ্যাডভোকেট আসিফ রেজা আনসারী, সোহারাব-গবেষক অধ্যাপক ড. তৌসিফ আহমেদ, অধ্যাপক ড. তৌসিফ শেখ, অধ্যাপক রেহানা খাতুন, অধ্যাপক রাকেশ মন্ডল, অধ্যাপক ড. মলয় দাস, অধ্যাপক ড. এক্রামুল হক চৌধুরী, অধ্যাপক বনানী ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মুকুলিকা রায়, অধ্যাপক ক্ষিতীশ ভট্ট, অধ্যাপক ড. সপ্তদ্বীপা কর্মকার, ড. পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক ড. বর্ণিনী মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক ড. আফতার হোসেন, অধ্যাপক কার্তিক চন্দ্র খান, অধ্যাপক শুভাশিস ভট্টাচার্য, অধ্যাপক কাইজার রেজা, অধ্যাপক মিঠু রায়, কবি হাবিব মণ্ডল, শিক্ষিকা নাজিমা বারী, তোর্সা রহমান, শিক্ষক নুরুল হক, শিক্ষক আসাদুজ্জামান মন্ডল, শিক্ষক মেহেবুব হোসেন, শিক্ষিকা মৌসুম আরা খাতুন, শিক্ষিকা রাকা চ্যাটার্জী, শিক্ষক মেহবুব হোসেন, শিক্ষক বিশ্বজিৎ দেবনাথ, শিক্ষক নুরুল হক, ময়ূখ ভট্টাচার্য, বাচিকশিল্পী বিদিশা চক্রবর্তী, চম্পা দাস, মাননীয় বাপ্পা সামন্ত, লীনা তাবাসসুম, ড. আজিজুল হক, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত মামুদ হোসেন, দেবাশীষ কুণ্ডু, সুমিতা কর্মকার, সায়ন পাল কর্মকার, তনয় সেন, সোহাগ রহমান, মনোয়ার হোসেন, কৃষ্ণা দাস, সায়ন কর্মকার, দিবাকর মিত্র, মোবাশ্বির তরফদার, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, রমেন পাত্র, নাসিম আরাফত, বুলি, জিয়াদ প্রমুখ। নব বারাকপুর প্রফুল্ল চন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে মাননীয় পাঁচু ওরাওঁ, সোমনাথ গোপ, নুপূর মিত্র, সুজিত দাস, সৌরভ, পার্থ দেবনাথ এবং ক্যান্টিনের মানিকদা। এছাড়াও ছিলেন সোহারাব হোসেনের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, ছাত্রছাত্রী ও গুণমুগ্ধজন।এর আগে সোহারাব হোসেন স্মৃতি সম্মাননা পেয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক মানস মজুমদার, সাহিত্যিক রক্তিম ইসলাম, সাধণ চট্টোপাধ্যায়, জাকির তালুকদার,অনিতা অগ্নিহোত্রী প্রমুখ।
![]() |
| রৌপ্যপদক প্রদান |
প্রসঙ্গত, ১৯৬৬ সালের ২৫ সে নভেম্বর তাঁর জন্ম। তাঁর মৃত্যু হয় ২০১৮ সালের ২ মার্চ। উত্তর ২৪ পরগনার এই কৃতি সন্তান ছাত্র জীবনেও অত্যন্ত সফল একটি নাম। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে রেকর্ড করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেটও করেন তিনি। কর্মজীবনে প্রথমে শিক্ষকতা পরে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি কলকাতার সিটি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখিতে পটু মানুষটি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ থেকে উপন্যাস সবেতেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। গ্রাম বাংলার চলমান জীবনের কথা স্থান পেয়েছে তার লেখায়। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস 'মাঠ জাদু জানে', 'সহবাস পরবাস', 'রাজার অসুখ' প্রভৃতি। অন্যদিকে 'আয়লা যুদ্ধ', 'সুখ সন্ধানে যাও' তার বিখ্যাত গল্প সংকলন। শিশু রচনায় উল্লেখযোগ্য 'রূপকথার পুতুল', 'ভূত পিসের ডাক' অত্যন্ত সমাদ্রিত পুস্তক। তিনি এক সময় পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের সভাপতিও হন। প্রশাসক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি শিক্ষকতা বা সাহিত্য চর্চায় নিমগ্ন থাকতেন না সমাজসেবা ও শিক্ষা প্রসারেও তাঁর অনুরাগ ছিল সমান্তরাল ভাবে। বিনা পারিশ্রমিকে বহু মেধাবী - অভাবী ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছেন তিনি। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০৮ সালে নতুন গতি পত্রিকার ' নতুন গতি পুরস্কার' এ সম্মানিত হন। তাছাড়াও নানা সামাজিক সংগঠনের তরফে সম্মাননা ও সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাঁকে।


0 Comments