বাজেট-২০২৬: বৃদ্ধি নয়, বৈষম্যই বাজেটের আসল গল্প- আইনজীবী আশফাক আহমেদ

আশফাক আহমেদ, অ্যাডভোকেট 

সরকার কাগজে-কলমে দাবি করছে যে ভারতীয় অর্থনীতি দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। FY26–এর দ্বিতীয় কোয়ার্টারে ৮.২% GDP বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে এবং গোটা বছরের জন্য ৭.৪% বৃদ্ধি অনুমান করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই বৃদ্ধি কার জন্য? সাধারণ মানুষ কি তার সুফল পাচ্ছেন?


১️⃣ GDP বৃদ্ধির সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির অমিল

রিপোর্ট অনুযায়ী, উৎপাদন খাতে ৮%–এর বেশি বৃদ্ধির দাবি থাকলেও Eight Core Industries মাত্র ২.৯% বৃদ্ধি দেখিয়েছে। এমন বৈপরীত্য সরকারি ডেটার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। IMF পর্যন্ত ভারতের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে ‘C grade’ দিয়েছে।

➡️ অর্থাৎ, GDP বাড়লেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভোগব্যয়—এই তিনটি মূল স্তম্ভে তার প্রতিফলন নেই।

২️⃣ কর্মসংস্থানহীন বৃদ্ধি (Jobless Growth)

FY24-এ কর্পোরেট লাভ বেড়েছে ২২%,

অথচ চাকরি বেড়েছে মাত্র ১.৫%।

২০১৭–১৮ থেকে ২০২৩–২৪-এর মধ্যে উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থানের অংশ কমেছে, উল্টো কৃষিতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪৬%, যা লুকোনো বেকারত্বের ইঙ্গিত।

➡️ বাজেট তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ।

৩️⃣ ঐতিহাসিক বৈষম্য: ধনীদের বাজেট, গরিবের বোঝা

World Inequality Report 2026 অনুযায়ী—

শীর্ষ ১০% মানুষের হাতে ৫৮% আয়,

নিচের ৫০% মানুষের ভাগে মাত্র ১৫%।

শীর্ষ ১% মানুষের হাতে ৪০% সম্পদ।

একদিকে ৩৫৮ জন ডলার বিলিয়নিয়ার, অন্যদিকে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দিনে ১০০ টাকারও কমে জীবনযাপন করছে।

➡️ এই বাজেট ধনীদের জন্য করছাড়, গরিবের জন্য GST ও জ্বালানি কর।

৪️⃣ মধ্যবিত্তের সংকট: আয় নয়, ঋণ বাড়ছে

গৃহস্থালি ঋণ GDP–র ৪১%-এ পৌঁছেছে।

২৮ কোটি মানুষ ঋণগ্রস্ত, গড় ঋণ প্রায় ₹৪.৮ লক্ষ।

বেতনের বড় অংশ EMI ও নিত্যপ্রয়োজনে খরচ হয়ে যাচ্ছে।

➡️ বাজেট আয় বাড়ানোর বদলে মানুষকে ঋণের ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে।

৫️⃣ কল্যাণমূলক ব্যয়ের কাটছাঁট

MGNREGA বাতিল করে অধিকারভিত্তিক কর্মসংস্থান তুলে নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় GDP–র মাত্র ০.৪% ও ০.২৯%।

খাদ্য সুরক্ষা ও পেনশন বরাদ্দ কমেছে; ৭৮% বয়স্ক মানুষ কোনো পেনশন পান না।

➡️ কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।

৬️⃣ রাজ্যগুলোর আর্থিক শ্বাসরোধ

কেন্দ্র কর আদায় করলেও সেস ও সারচার্জ বাড়িয়ে রাজ্যগুলোর প্রাপ্য অংশ কমানো হয়েছে। কার্যত রাজ্যগুলো পাচ্ছে মাত্র ৩২%, অথচ শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বড় ব্যয়ের দায়িত্ব তাদেরই।

উপসংহার

এই বাজেট বৃদ্ধির গল্প বলে, কিন্তু ন্যায়ের কথা বলে না।

এটি এমন এক অর্থনৈতিক নকশা, যেখানে—

কর্পোরেট লাভ নিশ্চিত,

কর্মসংস্থান অনিশ্চিত,

কল্যাণ সংকুচিত,

আর সাধারণ মানুষ ঋণগ্রস্ত।

সময় এসেছে সংখ্যার মোহ কাটিয়ে বাস্তব অর্থনীতির দিকে তাকানোর। নচেৎ “উন্নয়ন” কেবল রিপোর্টের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত) 

Post a Comment

0 Comments