SIR একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস?

-ডক্টর রামিজ রাজা

পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ (SIR)- এর ঘন্টা বেজেছে গতবছরের অক্টোবর মাস থেকে। নির্বাচন কমিশন বলছে এর আগে SIR করা হয়েছিল ২০০২  সালে। যদিও দেখা যাচ্ছে SIR  এর 'স্পেশাল' বস্তুটি ২০০২  সালে ছিল না। 'স্পেশাল' বস্তুটির আইনত ব্যাখা কি সেটাও অজানা। যাইহোক, এই তথাকথিত SIR শুরু হবার পর একাধিক স্টেজ অতিক্রান্ত। ড্রাফ্ট ভোটার তালিকাও বেরিয়ে গেছে। প্রথমে জানা গেল যারা আনম্যাপড ভোটার মানে যাদের ২০০২  এর সাথে লিঙ্ক করা যায় নি তাদেরই শুধুমাত্র হেয়ারিং হবে। কিন্তু সেই হেয়ারিং শেষ হতে না হতেই 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি' নামক একটি বস্তু হাজির।

এবার এই লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সিতে হেয়ারিং এর নোটিশ ধরানো শুরু হল লক্ষ লক্ষ ভোটারদের। নাম বা টাইটেলের মিস ম্যাচ, মা-বাবার বয়স না মেলা, মা-বাবার সাথে বয়সের ফারাক, দাদু-দিদিমার সাথে বয়সের ফারাক ও যাদের ছয় জনের বেশি বংশধর নির্বাচন কমিশনের মতে এইগুলি হচ্ছে 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি'। খবরে প্রকাশ ত্রুটিপূর্ণ AI ও সফটওয়্যারের উপর নির্ভর করে এই  Logical Discrepancy-র তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর অসংবেদনশীল চাপ পড়ছে।বয়স্ক নাগরিক, পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু ও আর্থিকভাবে দুর্বল ভোটারদের বারবার ডাকা, অনিশ্চিত শুনানি ও জটিল কাগজপত্রের মধ্যে ফেলে দিয়ে কার্যত একটি বৈষম্যমূলক ও ভীতিপ্রদ প্রশাসনিক আচরণে পরিণত হয়েছে এই SIR।


সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা করা হয় এই  SIR এর বিরুদ্ধে। গত ১৯ /০১ /২০২৬ এই মামলার শুনানি হয় এবং ২০/০১ /২০২৬  সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে একটি রায়ের কপি আপলোড করা হয়। সেই অর্ডারে লেখা আছে প্রায় 1.40 কোটি মানুষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই প্রায় 1.40 কোটি মানুষকে আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(i) ম্যাপড যাদের 2002 এর SIR এর সাথে লিঙ্ক আছে। সংখ্যা লেখা নেই।

(ii) আনম্যাপড যাদের 2002 এর সাথে লিঙ্ক নেই। সংখ্যা লেখা নেই।

(iii) তৃতীয়, লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি। সংখ্যা প্রায় 1.36 কোটি।

এখন যদি ধরে নেওয়া হয় এই রায়ের সকল বক্তব্য সঠিক আছে তাহলে প্রায় 1.40 কোটি নোটিশের মধ্যে 1.36 কোটি তৃতীয় ক্যাটাগরিতে পড়ছে মানে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি। তাহলে প্রথম দুই ক্যাটাগরিতে নোটিশের সংখ্যা শুধুমাত্র (1.40-1.36)= 0.04 কোটি বা 4 লক্ষ? এটা হতে পারে না কারণ বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে প্রায় 40 লক্ষ আনম্যাপড ভোটারদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং হেয়ারিং হচ্ছে। তাহলে কি সুপ্রিম কোর্ট অর্ডারের কপিতে অঙ্কের হিসেব নিকেশে ভুল করল?

কিন্তু যদি সুপ্রিম কোর্ট অঙ্ক ঠিক করে মানে যদি ধরে নেওয়া হয় এটা টাইপোগ্রাফিকাল এরর; তাহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি থাকা এই তৃতীয় ক্যাটাগরির ভোটাররা যারা নোটিশ পেয়েছেন তারা কি ম্যাপড ও আনম্যাপড ভোটারদের মধ্যে পড়ছেন না? কোর্টের অর্ডারের ভাষায় তাই ই মনে হচ্ছে। যদি এরকম হয় তাহলে সামনে ভয়ঙ্কর বিপদ। যদিও আমরা জানি, লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি শুধু ম্যাপড ভোটারদের মধ্যেই পাওয়া গেছিল। তাহলে কেন গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে হিসেব? উদ্দেশ্য কি? পশ্চিমবঙ্গের SIR নিয়ে তাহলে কি সুপ্রিম কোর্ট সিরিয়াস না?

এই সুপ্রিম কোর্টেই এই মামলার শুনানিতেই গত ১৯ /০১ /২০২৬  একজন সিনিয়র আইনজীবী ও একজন সিটিং জাজ মাধ্যমিক পাশ সার্টিফিকেটে জন্ম তারিখ (DOB) লেখা থাকে না বলে মন্তব্য করেছেন। স্টেট অথরিটির হাতে উপযুক্ত ক্ষমতা থাকা সত্বেও Family Register ও Permanent Residence Certificate (যা কমিশনের নোটিফায়েড ডকুমেন্ট) ইস্যু করা হচ্ছে না। সেখানে এডমিট কার্ডকে ডকুমেন্ট হিসেবে গ্রহণের আদেশে উদ্বেলিত হওয়ার বেশি কিছু আছে কি? এতে কতজনের লাভ হবে? ২০ বছর আগেও পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত প্রান্তিক এলাকায় ১০০ জন ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলে মাধ্যমিক পরীক্ষা অবধি ১৫-২০ জন ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন। তাই এই এডমিট কার্ড নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করলেও আনন্দিত হওয়ার খুব একটা কারণ নেই।

লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির বিভিন্ন ক্যাটাগরি সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট বা সুশীল সমাজে আলোচিত হলেও ভোটার বা তাদের মা-বাবার নাম বা টাইটেলের মিস ম্যাচ নিয়ে সেভাবে কোন আলোচনা হচ্ছে না। বছর দশেক আগেও রাজ্যের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একাধিক প্রান্তিক এলাকায় লিটারেসি রেট ছিল ৩০-৪০%। এই সকল মানুষদের সমস্ত ডকুমেন্টে নামের বানান বা টাইটেল কিভাবে ১০০ শতাংশ সঠিক থাকতে পারে?

চলমান SIR প্রক্রিয়া একটি গুরুতর প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে হাজার হাজার প্রকৃত ও যোগ্য ভোটার বাস্তবিক অর্থে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে পড়েছেন। এমনকি যথাযথ নথি পেশের পরও ভীত সন্ত্রস্ত অধিকাংশ মানুষ।    বহু ভোটার Hearing–এ বৈধ ও সরকার স্বীকৃত নথি জমা দেওয়ার পরও তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় থাকবে কি না—এই বিষয়ে কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত বা নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার চরম অভাব এবং স্বেচ্ছাচারের স্পষ্ট ইঙ্গিত। তাই লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সিযুক্ত এই Illogical SIR এবার বন্ধ হোক। ড্রাফ্ট ভোটার তালিকায় প্রকাশিত সকল ভোটার নাম ফাইনাল ভোটার লিস্টে তোলা হোক। এছাড়াও আনম্যাপড ক্যাটাগরিতে যারা হেয়ারিং এ এসেছেন তাদের সকলের নামও ফাইনাল ভোটার লিস্টে তোলা হোক। এই ধরনের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে তা শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় বরং গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার ভোটাধিকার হরণের শামিল, যা ভবিষ্যতে আইনগত ও সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব। )

Post a Comment

0 Comments