আসিফ রেজা আনসারী

বেশ কয়েকবছর ধরে কলকাতার পুজোয় প্রাধান্য পেয়েছে নিত্য-নতুন থিম ও দর্শকদের আকর্ষণ করবার প্রতিযোগিতা। সেখানে কোথাও দেখা যাচ্ছে বুর্জ খলিফা, কোথাওবা থিম হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে অপারেশন সিঁদুর। সেই জায়গায় থিমকে আরও বেশি বাঙ্ময় করে তুলেছে বেহালা ফ্রেন্ডস ক্লাব। এবারের পুজোয় এই ক্লাবের থিমে ঠাঁই করে নিয়েছে ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ও ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার করুণ কাহিনী।

উৎসব আবহে চারিদিকে যখন আলোর রোশনাই আর সংগীতের মূর্ছনা, তখন ফিলিস্তিন ও গাজায় হাজার হাজার শিশু-নারী ও অসহায় মানুষের আর্তনাদ। সেখানে নেই জল, নেই খাবার বা প্রয়োজনীয় ওষুধ, আছে কেবল আহাজারি ও দিনরাত ইসরাইলের বোমা-গুলি আঘাতে মানুষ খুন। লাগাতার এই হত্যালীলা গাজা উপত্যকাজুড়ে দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছে। একটা সময় বাংলায় এমন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। সেই তেতাল্লিশ সালে বাংলাজুড়ে অনাহারে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রখ্যাত শিল্পী জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যর ছবিতে ধরা আছে সেইসব দিনের করুণ কাহিনী। এছাড়াও বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক কালজয়ী হয়েছে। জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন, ‘সব যুদ্ধ-প্রচার, সব চিৎকার আর মিথ্যে আর ঘৃণা-এসব আসে সর্বদা তাদের কাছ থেকে যারা নিজেরা যুদ্ধ করছে না।’ বলা হয়, ব্রিটিশ এবং ভারতীয় পুঁজিপতিরা কেড়ে নিয়েছিল ফসল, যার ফলেই ঘটেছিল ভয়াবহ ‘৪৩-এর মন্বন্তর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পুঁজিপতিরা ছিনিয়ে নিয়েছিল সাধারণ মানুষের মেহনতের সোনার সম্পদ। ছিল কেবল মা’য়ের ক্ষুধার্ত সন্তানকে বাঁচানোর আর্তনাদ আর পঙ্গপালে ভরা গ্রাম-শহরের আকাশ। যেন ফিলিস্তিনে ৫৫০০ কিলোমিটার আর ৮২ বছরের দূরত্ব ইতিহাস মিলিয়ে দিয়েছে দুই ঘটনাকে।

বহুজাতিক সংস্থা যুদ্ধে সাহায্য করে বোঝাতে কোকাকোলার ফন্টে লেখা গণহত্যা 

জানা গিয়েছে, বেহালা ফ্রেন্ডস ক্লাবের এবারের পুজোর ভাবনা, পরিকল্পনা ও থিম নির্মাণ করেছেন শিল্পী প্রদীপ দাস। তিনি জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যে মন্বন্তর হয়েছিল বাংলায়, তার ছবি ধরা আছে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটকে। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন- ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়/ পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিনরা ছবি আঁকেন একই বিষয়ে। এটাই এবারের থিম। যুদ্ধকালীন করুণ সময় আঁকতে গেলেই অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসাবে চলে আসে গাজা। লাগাতার ইসরাইলি সেনার হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে একটা আস্ত শহর। সেখানকার পরিস্থিতি দেখে রাষ্ট্রসংঘ দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সমাজকর্মী নামা হাসান তাঁর কবিতায় যুদ্ধ ও ক্ষুধার হাহাকারের করুণ ছবি এঁকেছেন। সেই কবিতাও স্থান করে নিয়েছে থিমে।

দেখা গেল বেহালার মণ্ডপে প্রবেশ করতেই শোনা যাচ্ছে ফিলিস্তিনের ভাষায় নামা হাসান-এর কবিতা। কবিতাটির বাংলা ও ইংরেজি তর্জমাও আছে। দেবীর আবাহনের সুর আর গাজা উপতক্যার নিরন্ন মানুষের প্রার্থনা যেন মিলেমিশে গেছে। এছাড়াও ছবিতে-তুলিতে ফুটে উঠেছে বাংলাজুড়ে তেতাল্লিশের মন্বন্তর। এখানেই শেষ নয়, প্যান্ডেলে ঢোকার মুখেই এক পাথরের চাঁইয়ের উপর বড় করে আবছা অক্ষরে লেখা ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’। তারই উলটোদিকে কোকাকোলার ফন্টে লেখা ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা। বিশেষ ফন্ট ব্যবহার করে শিল্পীমন যুদ্ধের রাজনীতিতে পুঁজিপতিদের দ্বিচারিতা ও যুদ্ধবাজদের আর্থিক মদদ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

(তথ্য সৌজন্য পুবের কলম)