আসিফ রেজা আনসারী
নবী দিবস বিতর্ক....
ইসলাম ধর্মের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্মদিন পালন করা উচিত হবে কিনা, এ নিয়ে মুখপুস্তিকায় বেশ কিছু মানুষ বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে যে কথাগুলি আলোচনা হওয়া উচিত ছিল, সে সম্পর্কে কারোরই তেমন দৃষ্টি নেই। এ কথা বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে- এমন ঘটনা আজকের দিনের গুরুত্বকে ছোট করছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানব সভ্যতার কল্যাণ স্বরূপ পাঠানো হয়েছে। এ কথা ঘোষণা করেছেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রব্বিল আলামিন। সেই সূত্র ধরে মুসলিমরা যদি মুহাম্মদের জীবনাদর্শ এবং তার কর্মপদ্ধতির দিকে বেশি দৃষ্টিপাত করত তাহলে সমাজ পরিবর্তনে একটা দিশা পাওয়া যেত। দুর্ভাগ্য এই যে- ধর্মীয় শিক্ষার প্রকৃত আদর্শকে হৃদয়ের অন্তঃকরণ দিয়ে বোধগম্যতার স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং বাস্তবিক জীবনে তাকে প্রতিষ্ঠা করার কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। না যুবসমাজ না কোনও মাওলানা বা মুফতি, কারও দিক থেকেই এ বিষয়ে বিশেষ কোনও সদর্থক উদ্যোগ নেই। অথচ মুখে দাড়ি রাখতে হবে কিনা, কিংবা মাথায় টুপি দেওয়া আবশ্যক নাকি অনাবশ্যক অথবা নবী দিবস পালন করা জায়েজ (ন্যায়সঙ্গত) নাকি নাজায়েজ- এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক। এ কথা সত্যি যে- যারা এ নিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হচ্ছেন তাদের অনেকেই ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম নামায পালন করা নিয়ে বেখেয়াল। তারা ইসলামের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া তো দূরের কথা যে বিষয়গুলো ফরজ মানে বাধ্যতামূলক কর্তব্য সেগুলো সঠিকভাবে মানেন কিনা একটা সন্দেহ আছে। অথচ তারা ইসলাম নিয়ে বিতর্কিত কথা বলছেন। এ নিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার।
সম্পর্ক যেখানে ঈমানের.....
একজন ব্যক্তির সঙ্গে তার স্রষ্টার সম্পর্ক এবং এই বিশ্বাসের বিষয়কে আমরা ঈমান বলি। একজন উপাস্য এবং উপাসক অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে বান্দাহর সম্পর্ক নির্ভর করে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঈশ্বরের সঙ্গে তার নিজস্ব বোঝাপড়ার উপর। একজন ব্যক্তির সঙ্গে ঈশ্বর কি রকম আচরণ করবেন বা তার বিচার কিভাবে হবে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর ছেড়ে দেওয়াই উচিত হবে। তা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করা কিংবা কারও বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সমীচীন নয়। বরং তা ইসলামিক নীতি এবং আদর্শের খেলাপ। একজন বিধর্মী মানুষকেও ইসলাম ধর্মে আঘাতে বাধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, আর বর্তমানে মুসলিমরা নিজেরা নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য একে অপরকে ছোট করতে পিছপা হচ্ছে না। এর ফল কিন্তু ভয়ংকর। এই বিভেদ এবং বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির মানুষ রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করছেন। আর তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সমাজকেই।
![]() |
| Word Art by TBM |
এ কথা সবাই জানেন যে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে নানান কুরুচিকর মন্ত্যব্য করা হচ্ছে। মুসলিম বিদ্বেষের ঘনঘটা সর্বত্রই বিরাজমান। তবে এ কথা বলা যেতেই পারে নবীর আদর্শ ও জীবন-ব্যবস্থা যা তিনি প্রবর্তন করেছিলেন তাকে সঠিকভাবে মেনে চলছেন না মুসলিম সমাজ। হযরত মুহাম্মদ সা. তৎকালীন আরবের সমাজ ব্যবস্থায় বিপ্লব এনেছিলেন। শুধু তাই নয় গোটা বিশ্বেই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি নবজোয়ার এনেছিলেন। সামাজিক বিপ্লব ঘটেছিল।
একসময় মার্কসীয় দর্শন যেভাবে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি মুহাম্মদের প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক রণকৌশল, নয়া সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তনের শক্তির দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিল বিশ্ব-রাজনীতি। চৌদ্দশো বছর পরেও মুহাম্মদের অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনৈতিক রণকৌশল এবং কূটনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বাস্তব প্রয়োগ সমানভাবে প্রযোজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ সম্পর্কে একটা বৃহৎ অংশের মানুষের অজ্ঞানতা, অপ্রতুল জ্ঞান, অন্ধ বিশ্বাস ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে।
আসলে না জানা ও ভুল জানা, দুটোই ক্ষতিকর। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছেন কেউ কেউ। তাই বিভেদকামীদের এই বিদ্বেষ প্রচার ও অপকৌশলকে রুখতে হলে মুসলিমদেরকে সঠিক ভূমিকা পালন করতে। হবে কিন্তু কিভাবে?
নবী সা. তো একটি আদর্শ....
মুহাম্মদ সা.-এর জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানার্জন এবং বাস্তবিক জীবনে তার প্রয়োগের মাধ্যমে তারা ইসলামের সঠিক শিক্ষাকে তুলে ধরতে পারে। যা বর্তমান সমাজে মুসলিমদের সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেই, আছে কিছু উগ্রতা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াজনিত আলটপকা কর্মকাণ্ডের লোকজন। তারা বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি সৃষ্টি করছে অথচ গান্ধিগিরি করে, মুহাম্মদের পথ অবলম্বন করে এগুলোর জবাব দেওয়া যেত। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ্ অশান্তি সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।
যাঁর ছোঁয়ায় বদলে গেল সমাজ.....
হযরত মুহাম্মদ যখন ধর্মপ্রচার করছেন আরবের তায়েফ নামক এক জায়গায় তাকে প্রচুর অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে, অভিসম্পাত না করেই সেখানকার মানুষকে ক্ষমা করেছিলেন। ক্ষমা মুহাম্মদ সা.-এর জীবনী একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একান্তই অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, অত্যাচারকে রুখে দেওয়ার জন্য অস্ত্রধারণ যখন আবশ্যক হয়ে পড়েছে, তখনই যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন মুহাম্মদ সা.। অন্যথা শান্তিচুক্তি, ধৈর্যধারণ এবং ক্ষমা ছিল তার জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে প্রখ্যাত লেখক কে. এস. রামাকৃষ্ণ রাও লিখছেন_"পয়গম্বর মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আগমনের ঊষালগ্নে আরব একটা ধূ-ধূ মরুভূমি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁর অমিত আধ্যাত্মিকতার বলে এই প্রাণহীন ঊষর মরুভূমি পরিণত হল এক নতুন পৃথিবীতে—জন্ম হল এক নতুন জীবনের, এক নতুন সংস্কৃতির, এক অভিনব সভ্যতার ও এক সুপরিপক্ক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। এই সুবিশাল সমাজ-সভ্যতা কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থা ধীরে ধীরে পরিব্যাপ্ত হয়েছিল মরক্কো থেকে সিন্ধু নদী পর্যন্ত এবং যার অত্যাশ্চর্য প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মতো তিনটি মহাদেশের প্রত্যন্ত জনপদে। এইভাবে ইসলাম এই তিনটি জনবহুল মহাদেশের অগণিত জনগণের চিন্তা ও ভাবধারাকে প্লাবিত করেছিল।"
হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জীবন ও সাধনা ছিল অন্যমাত্রার। নবীকে ভালবাসতে হলে সেই পথকে অবলম্বন করতে হয়। কোনও ব্যক্তির আদর্শকে না মেনে মুখে ভালবাসি বলার নাম কখনোই ভালোবাসা বা শ্রদ্ধার হতে পারে না। নবীর জীবন অনেক অনেক দামি, উচ্চমার্গের। সে পথ অবলম্বন না করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যাওয়া বড় ভয়ঙ্কর পরিণতির জায়গা তৈরি করে। ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে দেখতে হলে বিভেদকামী শক্তি যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী, এমন অবস্থায় নবীকে ভালবাসতে হলে শিখতে হয় তিতিক্ষা, ভালোবাসা, সাধনা ও জীবনচর্যা।
এ কথা ভুলে গেলে হবে না মক্কা বিজয়ের পর এক মিলিয়ন বর্গমাইল জমি মুহাম্মদের পদতলে এসেছিল। অথচ তিনি নিজে জুতোসেলাই করতেন, তালি দেওয়া পোশাক পরতেন, নিজের ঘর নিজে পরিষ্কার করতেন, গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে স্ত্রীদের সঙ্গে হাতে হাত মেলাতেন। তিনি ইচ্ছে করলে প্রচুর অর্থ ও সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারতেন, অথচ মুহাম্মদ সা. বেছে নিয়েছিলেন সাধারণের জীবন। সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পর তার ছিল না কোনও নরম বিছানা কিংবা সিংহাসন। খেজুর পাতার বিছানাতেই ঘুমোতো মুহাম্মদ সা.। অধিক সময় ঈশ্বরের প্রার্থনা ও ইবাদতের কাটিয়ে দিতেন। স্রষ্টার দরবারে কেঁদে বুক ভাসায়ি প্রার্থনা করতেন, হে প্রভু আমাকে দায়িত্ব পালনের শক্তি দাও।
হযরত মুহাম্মদ সা. যখন পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন সেদিন তার ঘরে ছিল সামান্য কিছু মুদ্রা যার একটি অংশ দিয়ে ঋণশোধ করা হয়েছিল, বাকি অংশ দান করা হয়েছে এক গরীবকে যিনি তাঁর ঘরে সাহায্য পাওয়ার জন্য এসেছিলেন। ঘর থেকে সারা বিশ্বকে আলোয় আলোকিত করেছেন মুহাম্মাদ সা. তার মৃত্যুর পর সেই ঘরে অন্ধকার নেমে আসে, কারণ প্রদীপ জ্বালানোর মত তেল ছিল না। এমন জীবন-সাধনার সাধক ছিলেন মুহাম্মদ সা.। যে সাধনা মানুষকে শেখায় ভালোবাসা, মানুষকে শেখায় ত্যাগ-তিতিক্ষা যা গ্রহণ করেনি মুসলিম সম্প্রদায়। তাই লাঞ্ছনা-বঞ্চনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর থেকে উত্তরনের একটাই উপায় শিক্ষা ও সাধনা। মুহাম্মদের জীবনচর্চাকে জীবনের অংগীভূত করা, মুসলিমদের উচিত নিজেদেরকে অভিযোজিত করা।
সিরাত-উন নবী....
সমাজ পরিবর্তনে হযরত মুহাম্মদের ভূমিকা অপরিসীম। তিনি শুধু ধর্মীয় অজ্ঞানতা এবং বিভেদবিদ্বেষ ভেঙে নূতন সমাজ গঠন করার চেষ্টায় করেননি। একইসঙ্গে সমাজকে দিশা দেখিয়েছেন হযরত মুহাম্মদ। একটা সময় যখন আরবীয় সমাজে শিশুকন্যা জন্মানোর পরেই তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হতো, যখন নারীদের ন্যূনতম কোন সামাজিক রাজনৈতিক বা পিতৃ পুরুষের সম্পত্তির কোনও অধিকার ছিল না, যখন নারীরা রাস্তায় বেরোতে পারতেন না, যখন মানুষ প্রকাশ্যে একে অপরকে খুন করত, একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর লড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকত, সেই সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছেন হযরত মুহাম্মদ সা.। এটা কিন্তু ছোটখাটো বিষয় নয়। নবী দিবস পালনের জলসা-জৌলুষের কোনও প্রয়োজন নেই বরং নবীর প্রকৃত আদর্শকে সামনে রেখে সাম্যবাদ, মিলন সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিলিত সমাজ গঠনের প্রচেষ্টাই আজকের দিনটির অন্যতম গুরুত্ব হওয়া উচিত।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় হযরত মুহাম্মদ সা. যেমন দৃষ্টান্ত রেখেছেন মদিনা সনদে, যা সমস্ত জাতি-ধর্মের মানুষকে নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করেছিল। সেই মুহাম্মদের আদর্শকে বাস্তবিক জীবনে প্রতিষ্ঠা করার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হবে দিনটির তাৎপর্য।
[লেখক পেশায় সাংবাদিক, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে স্বাধীন গবেষক।]

0 Comments