আসিফ রেজা আনসারী
প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশের সংসদে গ্রাম্য শব্দ ‘চুদুরবুদুর’ বলা নিয়ে প্রবল হৈ-হট্টগোল হয়েছিল। পরে অবশ্য ভাষাত্ত্ববিদদের যুক্তি ও সংসদে আলোচনার প্রেক্ষিতে সেই শব্দকে মান্যতা দিয়েছিল বাংলাদেশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। পড়শি দেশ পারলেও ক্রমশ ‘অসহিষ্ণু' হয়ে উঠছে ভারতের পার্লামেন্ট। বিরোধিরা অন্তত এমনই অভিযোগ করছে। আসলে আসন্ন বাদল অধিবেশনের আগে ‘লজ্জাজনক’, ‘নির্যাতন’, ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘নাটক’, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’, ‘অযোগ্য’ বা ‘ভণ্ডামি’র মতো শব্দকে সংসদের সচিবালয় ‘অসংসদীয়’ শব্দ বলে উল্লেখ করেছে। যা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিরোধিদের অভিযোগ, এভাবে জোর করে সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করতে চাইছে মোদি সরকার। অনেকেই বলছেন, আদোতে মানুষের জন্য কথা বলার পথকেই অবরুদ্ধ করা হচ্ছে। বিরোধিদের যুক্তি, সংসদ বা পার্লামেন্ট হচ্ছে দেশের সার্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরার আদর্শ জায়গা। শাসকদলের সামনে চোখে চোখ রেখে কথা বলা এবং নাগরিক অধিকার আদায় করার জন্য মোক্ষম চাল দিতে তৈরি থাকেন বিরোধিরা। সেই জায়গাতেই বেশ কিছু শধকে ‘অসংসদীয়’বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যা নিয়েই সুর চড়িয়েছেন বিরোধী দল ও বিশিষ্টজনেরা।
| TBM |
সংসদে ‘শব্দে লাগাম’পরানোকে তীব্র কটাক্ষ করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্রভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকার। তিনি বলেন, সংসদ শব্দ ঠিক করে দেবে এটা ঠিক বলে আমার মনে হয়নি। পার্লামেন্টে শাসকদল সংখ্যাগরিষ্ট, ফলে সমালোচনার জন্য ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা বিরোধিদের হাতিয়ার। সেখানে সংসদ শব্দ ঠিক করে দিতে পারে না। তবে এই শব্দ ছাড়াও অন্যভাবে সমালোচনা করা যায়, আমি মুখে নিকম্মা না বলেও বুড়ো আঙুল দেখাতে পারি। আসলে শব্দের যে কি শক্তি তা তারা জানেন না। ভাষার ক্ষমতা শব্দের উপর নির্ভর করে না। স্বৈরাচারি মনোভাব নিচ্ছে সরকার। এত বেকারত্ব, অভাব ঢাকতে এবং আসল সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতেই সরকার এইসব করছে।
অন্যদিকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা প্রাক্তন সাংসদ মুহাম্মদ সেলিম বলেন, জরুরি অবস্থার মতো ব্যাপার। সংসদ হচ্ছে সরকারের কাজকর্ম দেখা ও সমালোচনার জায়গা। সমালোচনা বন্ধ করতেই শব্দে লাগাম পরানো হচ্ছে। আসলে সরকার কারও কথা শুনতে চাইছে না। সংসদে চেঁচামেচি হবে, জুতো ছোঁড়াছুড়ি হবে, যুক্তি-তর্কের লড়াই হবে। সমস্ত দিক থেকে সরকার স্বৈরাচারি হয়ে যাচ্ছে। চুরি হবে, মব-লিঞ্চিং হবে অথচ নাকি তা বলা যাবে না। আসলে অপরাধকে আড়াল করা ও বিরোধিদের মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে।
একইভাবে পার্লামেন্টে এমন শব্দ-বিধি নিয়ে সরব হয়েছেন কংগ্রেস সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরি। তিনি বলেন, এগুলি খুব অন্যায় করা হয়েছে, আমরা মানছি না। আমরা মনে করি অসংসদীয়ভাবেই এইসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। মানুষের প্রতিবাদ ও মুখকে আটকানোর জন্যেই স্বৈºরাচারিতার পথ নেওয়া হচ্ছে। পার্লামেন্টের বাইরে বুলডোজার চালানো হচ্ছে, অন্যদিকে ভেতরেও বুলডোজ করার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা নিন্দা করছি। পার্লামেন্টকে কারও ‘মা-মাসি’করতে দেব না।
তৃণমূলের পক্ষ থেকেও পার্লামেন্টে শব্দ ব্যবহারের বিধি নিয়ে সরব হয়েছেন সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়। তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, নতুন নতুন নিয়ম করা হচ্ছে। শব্দ তালিকা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে, এটা ঠিক নয়। আসলে বিরোধী শক্তিকে জব্দ করার জন্যেই এটা করা হচ্ছে। কারণ, অপদার্থকে অপাদার্থ বলব না বা অক্ষমকে অক্ষম বলব না তো কি বলব? অন্যদিকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
সৌজন্যে পুবের কলম
0 Comments