বাবুলযোগ ও অর্জুনবাণ: তৃণমূলের ভণ্ডামি না রণকৌশল?

আসিফ রেজা আনসারী

চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকা যথেষ্ট প্রশ্নের অবকাশ তৈরি করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে যতই ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করুন না কেন, তিনি আদতে আর পাঁচটা বিরোধী দলের মতোই হিন্দুত্বের পথে হাঁটছেন, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধর্মনিরপেক্ষ এবং উন্নয়নকামী একটা বড় অংশের মানুষের ভোট পেয়ে দিল্লির কেজরিওয়াল যখন ক্ষমতায় আসেন, তারপরে বড় রকমের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে দিল্লির বুকে। সেই দাঙ্গা প্রতিরোধে কিংবা দোষীদের শাস্তি বিধানের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সকলেই জানেন। আর একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একুশের নির্বাচনে মুসলিম, ধর্মনিরপেক্ষ এবং শান্তিকামী হিন্দুদের একটা বড় অংশের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসেন। তার পরেও সেই সরকার কোনোভাবেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের কল্যাণের দিকে দৃষ্টিপাত করেনি। এটা অভিযোগ নয়, তথ্য বলছে পশ্চিমবাংলায় সংখ্যালঘু মুসলিমদের চাকরি, রাজনৈতিক অবস্থান ও ক্ষমতায়নের যে সার্বিক অংশগ্রহণ তা সেই একই তলানীতে রয়েছে। রয়েছে বললে ভুল হবে, রাখা হয়েছে1 আসলে এদেরকে ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহারের সুকৌশল অবলম্বন করছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব।

তৃণমূল চালাকি ক্রমশ প্রকাশ্যে:- আসানসোল দাঙ্গায় যে মানুষটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন রয়েছে, সেই মানুষটার নাম বাবুল সুপ্রিয়। অভিযোগ, মানুষটার হাতে রক্তের দাগ লেগে আছে, আসানসোলের ইমাম রশিদীর ছেলের খুনের রক্ত যার হাতে-মস্তিষ্কে, সেই বাবুল সুপ্রিয়কে নিজেদের দলে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, মুসলমানদেরকে কেমন চোখে দেখে তৃণমূল। বিহার, উত্তরপ্রদেশ কিংবা বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যে মবলিঞ্চিংয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে, এর থেকে পশ্চিমবঙ্গ কোনও অংশেই পৃথক নয়। এ রাজ্য এমন ঘটনা আকছার ঘটছে। সংবাদমাধ্যম অবশ্য সে ঘটনাকে সঠিকভাবে তুলে ধরছে না। হাথরাস নিয়ে রাজনৈতিক তরজা হয় সেই, একই ঘটনা আমাদের রাজ্য হাঁসখালি, নামখানা বা ইংলিশবাজার ইত্যাদিতে। তৃণমূল এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করছে না, করবেই বা কেন! সাধারণ মানুষের প্রতি তো আসলে কোন দরদ নেই, যা আছে তা এক প্রকার ভন্ডামি।
আজ হঠাৎ করে ব্যারাকপুরের সাংসদ অর্জুন সিং তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। নির্বাচনের আগে হুগলির তেলিপাড়ায় এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন জাতীয় মিডিয়ায় এবং স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দাঙ্গার পেছনে ছিলেন ব্যারাকপুরের সাংসদ তথা বিজেপি নেতা অর্জুন সিং। সেই অর্জুন সিং এখন মাওলানা অর্জুন সিং হবেন। যেহেতু তিনি তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এবার ঘোমটা দিয়ে বা টুপি পরে ইফতার পার্টিতে যাবেন, তার আর কোনও পাপ থাকবে না। বাহ ওয়াসিং মেশিন!
এই তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার পেছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা দীর্ঘ লড়াই এবং সংগ্রামের অবদান রয়েছে। তিনি অবশ্য তা সহজে ভুলে যেতে চান। বর্তমানে যাদেরকে নিয়ে ঘর করছেন তারা আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে রয়েছে। প্রাইমারি, স্কুল সার্ভিস কমিশন, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, গ্রুপ-ডি- এমন কোনও পরীক্ষা নেই যেখানে দুর্নীতি হয়নি। পরীক্ষা না দিয়েও চাকরি দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটেছে।

Photo TBM
 
রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়াছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তিনি নাকি তৃণমূলের মহাসচিব। একটা সামান্য কাজেও যদি দিদির অনুপ্রেরণা লাগে, তাহলে এই এত বড় দুর্নীতিতে তিনি নীরব থাকতে পারেন?
পরেশ অধিকারী বাম আমলে একজন মন্ত্রী, তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্রের দল ফরওয়ার্ড ব্লক করতেন। তাকে তৃণমূলে আসার জন্য তিনটি লোভ দেখানো হলঃ তিনটি শর্তের কথা তৎকালীন তৃণমূল নেতা তথা মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন। তাকে এমপির টিকিট, মেয়ের চাকরি ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার শর্তে পার্থ চট্টোপাধ্যায় দলে নিয়েছিলেন। তাহলে অঙ্কিতা অধিকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আদালতে যা প্রমাণিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। যা নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা তৃণমূলের।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি প্রকৃতই বিজেপি বিরোধী মুখ হতে চান, তাহলে তাকে আরও কড়া হতে হবে। চোরেদেরকে দল থেকে বিতাড়িত করতে হবে। কেননা তিনি নির্বাচনের সময় বলেছিলেন প্রার্থী নয়, আমাকে দেখে ভোট দিন। তাহলে রাজ্যের মানুষ মমতাকে দেখে ভোট দিয়েছেন। যদি তাই হয় সেই চোরদের দল থেকে বহিষ্কার করতে তার এত দ্বিধা কেন? আদালত মন্তব্য করেছে বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। তিনি কি সেই সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারবেন? তা অবশ্য সময় বলবে। তবে এ কথা ঠিক একদিকে ডিএ মামলা, অন্যদিকে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির একাধিক মামলা নিয়ে যথেষ্ট বিব্রত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মোহন ভাগবতকে ফুল-ফল-মিষ্টি না দিয়ে হতো না? নাকি দোসর! 

Post a Comment

0 Comments