করোনায় বন্ধ শিক্ষাপ্রাঙ্গন, বন্ধুদের স্কুলছুট হওয়া রুখতে বাড়িতেই লাইব্রেরি গড়েছে দ্বাদশের রাহিলা

আসিফ রেজা আনসারী

মানুষের জীবনযাত্রা ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে করোনা এসে যেন থমকে গেল সবটা। গোটা দুনিয়া সঙ্গে রাজ্যেও বন্ধ হয়ে পড়ে স্কুল–কলেজ। বাড়ি ফিরতে নাস্তানাবুদ হতে হল পরিযায়ী শ্রমিকদের। এরই মাঝে নীরবে আস্ত লাইব্রেরি গড়ে তুলেছে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়া অষ্টাদশীর 'কণ্যাশ্রী' রাহিলা খাতুন। মেয়ের অসাধ্যসাধনে আব্বা–আম্মাও পাশে থেকেছেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন দুই সমাজসেবী জ্যোতিষ্ক দাস ও প্রিয়ম রায়। সঙ্গী হয়েছেন সম্পর্কে পিসি স্থানীয় কলেজ পড়ুয়া আরজিনা খাতুন। আর সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় রাহিলাদের লাইব্রেরি হয়ে উঠেছে বিকল্প। বর্তমানে নিজের গ্রাম আসিনা সহ আশপাশে কয়েকটি গ্রাম থেকে পড়ুয়াদের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২০০–র অধিক। রাহিলা খাতুনরা চার-পাঁচটা কাঠের দ্বিতল তাকে সুন্দর করে সাজিয়েছে বই। রয়েছে পানীয় জলের বন্দোবস্ত। আর বই পড়ার জন্য কিছু চেয়ার। রোজ দুইবেলা বসে পড়াশোনার আসর।
Library Room of Rahila And Ors

প্রসঙ্গত, রাহিলা খাতুনের বাড়ি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ফলতা থানার অন্তর্গত নওপুকুরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের আসিনা গ্রামে। সে নবাসন তুষ্টুচরণ হাই স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। সামনেই তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। করোনা আবহে স্কুল বন্ধ থাকায় মার খাচ্ছিল পড়াশোনা। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক। লক্ডাউনের সময় তাদের নিদারুণ যন্ত্রণা ভাবিয়ে তুলেছিল রাহিলাকে। অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা যাতে পড়াশোনা থেকে দূরে না চলে যায়, কেউ যাতে স্কুলছুট না হয়ে পড়ে, সেই ভাবনা থেকেই লাইব্রেরি গড়ার কথা মাথায় আসে তার।
রাহিলার কথায়, লকডাউনের সময় গরিব মানুষগুলোকে এখানে বাইরে থেকে অনেকেই সাহায্য করতে এসেছিলেন। তাদের কাছে স্থানীয়রা বইপত্র ও শিক্ষা সরঞ্জাম দেওয়ার আর্জি জানান। কিন্তু সবাইকে আলাদা করে কিছু দেওয়া কষ্টসাধ্য। সেই থেকেই লাইব্রেরির ভাবনা। সবাই যাতে পড়াশোনার মধ্যেই থাকে তাই বিকল্প ভাবতে গিয়েই পাঠচক্র লাইব্রেরির রুপ নিয়েছে। সাহায্য করেছেন জ্যোতিষ্ক দাস ও প্রিয়ম রায়।
Rahila Khatun and Ors

রাহিলা জানায়, লাইব্রেরিতে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সিলাবাসের বই রয়েছে। টেক্সট বইয়ের পাশাপাশি ৬–৭ সেট করে সহায়ক বইও আছে। শুধু স্কুলের বই নয়, কলেজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়বর্ষে মিলিয়ে বেশ কয়েকটি বইও জোগাড় হয়েছে। বর্তমানে লাইব্রেরিতে প্রায় নয় জন সহযোগী রয়েছেন। এই সার্বিক তত্ত্বাবধানকারীর দলে রয়েছেন রাহিলার মা ফতেমা।
ব্যাপক সাড়া ফেলেছে রাহিলা, আরজিনা, রুনা খাতুনদের প্রয়াস। লাইব্রেরিটা আরও বড় হয়ে উঠুক চাইছেন সকলেই। কিন্তু আরও বইপত্র দরকার। তা আসবে কোথা থেকে? রাহিলাদের আশা, ভালো কাজের মানুষ কোথাও না কোথাও আছেনই। আমরা আশাবাদী সমাজসেবী মানুষরা আমাদের পাশে দাঁড়াবেন।
সৌজন্যে: পুবের কলম দৈনিক
( বেঙ্গল মিরর একটি স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক ব্লগ।পাঠকের কাছে কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়। বৃহত্তর সমাজের কাছে সমাজের সম্প্রীতি, মিলন ও অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা প্রকাশ করা হয়।) 

Post a comment

1 Comments