সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন, ইতিহাস বিকৃতির বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত: সিপিএম

বেঙ্গল মিরর ডেস্ক: সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জী রোড’ করার কলকাতা পুরসভার সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর প্রকাশ্য মন্তব্যে কড়া প্রতিক্রিয়া জানাল সিপিএম। দলের তরফে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'আমরা গভীর ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।' 

এক লিখিত বিবৃতিতে সিপিএমের তরফে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, সমগ্র প্রচারাভিযানটি একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক অসত্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। জনসাধারণের সামনে এমন ধারণা তৈরি করার চেষ্টা চলছে যেন সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ-এর নাম অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে রাখা হয়েছিল এবং সেই নাম অপসারণ করাই নাকি ‘ইতিহাস সংশোধন’। বাস্তব সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। কলকাতার সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ-এর নামকরণ করা হয়েছিল বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর স্মৃতিতে। তিনি ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, তাঁর পরেই উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনজীবনে স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর অবদান ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত। তাই প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী কি এই প্রাথমিক ঐতিহাসিক তথ্যটুকুও জানেন না? যদি না জেনে থাকেন, তাহলে তা তাঁদের অজ্ঞতার পরিচয়। আর যদি জেনেশুনেই এই প্রচার চালিয়ে থাকেন, তাহলে তা ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। আরও উদ্বেগের বিষয়, একজন শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্যের নামকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে গুলিয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এটি কেবল তথ্যগত ভুল নয়; এটি ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, এই অসত্য প্রচারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। যে রাজ্য একদিন বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা এবং অসংখ্য মনীষীর জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য বহন করেছে, সেই রাজ্যের শাসকরা আজ ইতিহাস ও শিক্ষার প্রশ্নে এমন নির্লজ্জ তথ্যবিকৃতি করছেন—এটি সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক পরম্পরার প্রতি অপমান।

আমরা মনে করি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইতিহাসকে বিকৃত করে, মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার একটি বৃহত্তর প্রকল্পেরই অংশ। তথ্য, গবেষণা ও দলিলভিত্তিক ইতিহাসচর্চার বদলে আবেগ, বিদ্বেষ ও অর্ধসত্যকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে।"

 লিখিত বিবৃতিতে সিপিএমের তরফে দাবি করা হয়েছে, "অবিলম্বে এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে। সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ-এর প্রকৃত ইতিহাস এবং নামকরণের প্রেক্ষাপট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভ্রান্তিকর ও অসত্য বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বাংলার মানুষ ইতিহাস বিকৃতি মেনে নেবে না। বাংলার ঐতিহ্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, রাজনৈতিক প্রচার কিংবা শাসকের খেয়ালখুশির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; তা প্রতিষ্ঠিত সত্য, যুক্তি, শিক্ষা ও মানবতাবাদের উপর। আজ প্রশ্ন কেবল একটি রাস্তার নামের নয়। প্রশ্ন হল— ইতিহাসের জায়গায় মিথ্যা, শিক্ষার জায়গায় অজ্ঞতা এবং সত্যের জায়গায় রাজনৈতিক প্রচারকে বসিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা কোথায় দাঁড়াব। ইতিহাসের সংশোধন নয়, ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই আজকের প্রধান কর্তব্য।"

Post a Comment

0 Comments