হিন্দুরাষ্ট্রের পথে দেশ, নাকি হিন্দুদের বোকা বানানোর ছক? একটি বিকল্প বিশ্লেষণ

আসিফ রেজা আনসারী


অন্য-বস্ত্র-বাসস্থান এবং নিত্যনৈমিত্তিক যে সমস্ত জিনিস মানুষের জীবনে অপরিহার্য, এসবের আর কোনও বালাই নেই। এখন দেশজুড়ে শুধু ধর্মের দামামা বাজছে। এখন রামের নামে যেভাবে ভজনা শুরু হয়েছে তা দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে মানুষের জীবনে কোনো সমস্যা নেই, এখন যেন 'ধম্মকম্মই' মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। আদতে কিন্তু তা নয়, দেশজুড়ে অসম্ভব ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক চরম অবক্ষয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক যে মানব উন্নতির মাপকাঠি তা চূড়ান্ত ধরনের তলানিতে ঠেকেছে। আর এইসব থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে কেন্দ্রীয় শাসকদল মেতেছে ধর্ম-ধর্ম খেলায়। দেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু এখনও প্রকৃত শিক্ষার আলো থেকে শত যোজন দূরে রয়েছে, ফলে এইসব সাধারণ মানুষকে ধর্মের এই মোহজালে আটকে দিতে পারলেই ব্যস। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ফায়দা পেতে পারে বিজেপি, একথা ভেবে নিয়েই সংঘঘনিষ্ঠ দলটি রামের নামে মহোৎসবে মেতেছে। বিরোধীদলগুলির আশঙ্কা বিজেপি হয়তো হিন্দুত্বের তাস খেলে দেশের একটা বড় অংশের ভোট হাতিয়ে নিচে চলেছে। তাই তারাও সুযোগকে হাতছাড়া করতে চাইছে না। তাই ভিন্নপথে এই ধর্মকে সম্বল করেই ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছে তারাও। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই রামমন্দির নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে ভারত কি তাহলে হিন্দুরাষ্ট্রের পথে এগোচ্ছে, নাকি সুকৌশলে সাধারণ হিন্দুদেরই বোকা বানাচ্ছে বিজেপি?


বিরোধীরাও হিন্দুত্বেরই পথে? 

বিশেষ করে সংঘঘনিষ্ঠ দলগুলি যখন অযোধ্যায় রামমন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ রচনা করে ফেলছে, ঠিক সেই সময় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধি অসমের শিবমন্দিরে যাচ্ছেন পুজো দিতে। তাকেও কোথাও গিয়ে দেখাতে হচ্ছে তিনি হিন্দুত্বেরই প্রতীক। মন্দির উদ্বোধনে যোগ দিলে হয়তো ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ কিংবা মুসলিম ভোট পেতে হবে, তাই সরাসরি যোগ দিতে পারছে না, সেই কারণেই কৌশল! ওই লখিন্দর-বেহুলার রাজা চাঁদ সওদাগরের বাঁ হাত দিয়ে পূজা করা! অন্যদিকে, এই আসর থেকে নিজেকে কেন সরিয়ে রাখবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনিও আশ্রয় নিলেন সর্বধর্মসমন্বয়ের নামে এক মহামিছিলের। ২২ জানুয়ারি রামমন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠার দিন কলকাতায় বড় মিছিলের আয়োজন করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিও কালীঘাটের মন্দিরে পুজো দিয়ে পথে নামবেন। রাস্তায় বিভিন্ন ধর্মের উপাসনাগৃহের উপর দিয়ে যেতে যেতে তার মিছিল শেষ করবেন মুসলিম প্রধান এলাকা, পার্ক সার্কাসে। 

Image source: X 

মানুষের কথা কই? 

এখন প্রশ্ন হল গোটা দেশে বেকারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিদিনই কমছে ভারতীয় টাকার মান। আন্তর্জাতিকস্তরে ভারতের বিভিন্ন ভারতের অবস্থানের মানদণ্ড ক্রমশ নিচের দিকে যাচ্ছে। তাহলে কি এইসব দিক থেকে মানুষের মুখ ফেরাতেই কৌশলী পথে এগোচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি। আর এই বিষয়টা বুঝতে পেরেই ধর্মকে আশ্রয় করে বাকি দলগুলিও মানুষের জীবন-জীবিকার সাধারণ প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে ধর্মসুধা পান করিয়ে নিজেদের ফায়দা লুঠতে চাইছে? নাকি আরএসএসএর সেই স্বপ্নপূরণ অর্থাৎ হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে রাস্তাকে আরও মসৃণ করতে চাইছে সব দল।

Source: internet

অনেকেই মনে করছেন- এখন দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্নীতিতে ডুবে রয়েছে। আর তাই শাসক ও বিরোধী হাতে হাত মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে নিজেরাই নাটক মঞ্চস্থ করছে। আর এই মন্দির-মসজিদ রাজনীতির মধ্য দিয়ে নিজেদের তখ্ত টিকিয়ে রাখতে চাইছে। আর তা না হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে নিয়ে যে মৌলিক প্রশ্নগুলো উঠছে প্রতিদিন, তা নিয়ে সব দল কেন নিশ্চুপ? প্রশ্নটা তো থাকবেই... 

Source A-Z Quotes

পুনশ্চ

বিগত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কথা বারবার ঘুরে ফিরে প্রচারের আলোয় আসছে যে, যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল তার থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে তৈরি হয়েছে নতুন রামমন্দির। আর যেখানেই ২২ তারিখে মহাধুমধাম করে মন্দির উদ্বোধন হবে। বাবরি মসজিদ যে জায়গায় ছিল ঠিক সেই জায়গাতেই নাকি মসজিদ তৈরি হচ্ছে। এ কথা যদি সত্যিই হয় তাহলে বিদেশ থেকে কালোটাকা এনে সবাইকে ১৫ লাখ করে দেওয়ার মতো এটাও মোদি-শাহের বড় একটা ভাওতাবাজি। তবে আমাদের দেশে যেখানে মানুষকে ধর্মসুধা পান করিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে সুযোগ পায় রাজনৈতিক দলগুলি, সেখানে মানুষ কতটা সচেতনভাবে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তা নিয়ে প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়।

Post a Comment

0 Comments