বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য: একটি নাম, একটি অভিমান আর অহংকার

আসিফ রেজা আনসারী

নন্দীগ্রাম। রাজ্য রাজনীতিতে একটি নাম, একটি আতঙ্ক, একটি ইতিহাসের সমাপতন। একটি ষড়যন্ত্র কিভাবে পালাবদলের সূচনা করেছিল, সত্যিটা কী ছিল, সে কথা ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে। সিঙ্গুরে শিল্প কারখানা তৈরিতে কারা কারা বাধা দিয়েছিল, কী নাটক হয়েছে, সে কথাও মানুষ জানে এবং ক্রমশ সত্যটা প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমান সিঙ্গুর যেন বধ্যভূমি। নাহ! মানুষের আপত্তি তেমন ছিল না। মাননীয়ার আপত্তি ও গোঁয়ার্তমীর জন্য রাজ্যে শিল্প সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান ও বেকারদের স্বপ্ন চুরমার হয়েছে। বর্তমান সিঙ্গুর কিন্তু তাই বলছে। না হচ্ছে চাষাবাদ না হয়েছে শিল্প। ফলে কতকগুলি ঘটনা খুব মনে পড়ছে। একটা বলতে কোনও কুণ্ঠাবোধ নেই যে- বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হেরেছেন চক্রান্তের কাছে, জিতেছেন শত সহস্র বেকার, যৌবন ও সত্যের কাছে।

Buddhadeb Bhattacharjee, ex Chief minister of West Bengal

আজ, জার্মানির রাইখস্ট্যাগ ষড়যন্ত্র বা অগ্নিকাণ্ডের কাহিনী খুব মনে পড়ছে। সালটা ১৯৩৩, ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৯ টায় হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টির লোকেরা নিজেরাই রাইখস্ট্যাগে আগুন দেয়। একইসঙ্গে রটিয়ে দেওয়া হয়, এটা কমিউনিস্টদের কাণ্ড। এই বদনাম দিয়ে জনগণকে উত্তেজিত করার পরের ধাপে নিজেরা ধরে ধরে কমিউনিস্টদের কোতল করা শুরু করে। দেশজুড়ে একটি বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কমিউনিস্ট জেলবন্দি করা হয়। যেমন নন্দীগ্রামের নামে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্য কিন্তু অন্য কথা বলে।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় ঘটনা ঘটে, বাম আমলে। নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে মারা যান বেশ কয়েকজন। যদিও মানুষজনের মৃত্যুতে রাজনৈতিক লাভ ওঠায় তৃণমূল কংগ্রেস। কাঠগড়ায় তোলা হয় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও তার দলকে। সরকারের পালাবদল হয়। এটা ইতিহাসে লেখা আছে ও থাকবে। এর সাথে পাদটিকা হিসাবে আগে একটি ঘটনা যুক্ত হয়েছিল। ওই ফায়ারিং এর আদেশ দেওয়া পুলিশ কর্তার পদোন্নতি হয় সরকার বদলের পরে। উনি অবসরের পরে শাসকদলে যোগ দেন। যে মাওবাদীদের সহযোগিতা ও সিদ্দিকুল্লার সমর্থন নিয়ে নিজের পালে হাওয়া লাগিয়েছেন মাননীয়া, সেই তরী আজ ডুবছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পতন সূচনাকারী, অধিকারী পরিবার, জ্যোতি বসুকে মারতে যাওয়া সোনালী গুহ আজ বিজেপিতে। কি অদ্ভুত সমাপতন, ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস।
অন্যদিকে, ২১ জুলাই নিয়ে যে নাটক হয় তার সেই কর্তাও তৃণমূলের সরকারে মন্ত্রী হন। রাজ্যসভার সাংসদও, সেই মণীশ গুপ্ত আজ তৃণমূল নেতা।
নন্দীগ্রাম নিয়ে ফের দ্বিতীয় পাদটিকা যুক্ত হল। জানা গেল, নন্দীগ্রামে ওই সময়ের আলোড়ন ফেলে দেওয়া ঘটনা ছিল ষড়যন্ত্র।
এ কথা প্রমাণিত যে- নন্দীগ্রামে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জিতেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বীকার করছেন, নন্দীগ্রামে সেই অভিশপ্ত ১৪ মার্চ বামফ্রন্ট সরকার পুলিশ ঢোকায়নি। নন্দীগ্রামের যে গুলিচালনার ঘটনায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বা রাজ্য সরকারের কোন চক্রান্ত ছিল না।
নন্দীগ্রাম নিয়ে সিবিআই তদন্ত হয়েছে। কোনও বাম নেতাকে তো দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি! সিবিআই চার্জশিটে তো কারও নাম নেই। জানা গিয়েছে, তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ করেছিল ৩০জন পুলিশ আহত হওয়ার পরে৷ আইনশৃঙ্খলা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল বলে কন্ট্রোল করতে চেয়েছিল প্রশাসন।
আর একটি ঘটনা- ফিদেল কাস্ত্রকে যুদ্ধ অপরাধী ও মানবতার শত্রু বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছিলেন- "একদিন সত্যিগুলো সামনে আসবে, একদিন চক্রান্তগুলোর কথা জানা যাবে, ইতিহাস আমায় মুক্তি দেবে। আমাকে অপরাধী বানাতে পারো, এটা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে।"
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বয়স ৭৭ বছর। সিওপিডির রোগী। কিন্তু ক্যারিস্মাটিক মানুষটি সুযোগ পেলে সিগারেটে টান দেন। মহাকরণে যেমন যেতেন। কেমন শক্তি নেই শরীরে। আছে কেবল অভিমান। সেই মানুষটি আজ বড্ড অহংকারী। জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারছেন সত্য প্রকাশিত হচ্ছে।
মনে পড়ছে, সালটা ২০১১। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সংগ্রামপুরের মাঠে সিপিএমের জনসভা। তিনি বলছিলেন - বন্ধুগণ আমরা এসএসসি, এমএসসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করি। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কসুর করব না। কিন্তু দিদির সরকার আসলে স্কুল সার্ভিস কমিশন তুলে দেবে। চাকরির স্বপ্ন যন্ত্রণা হয়ে দেখা দেবে। সাবধান হোন। আমার যৌবন, আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেবে। নষ্ট হয়েছে কিনা আমি বলব না। যাঁরা আপার প্রাইমারি, এসএসসি, এমএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন, ভেট দেননি বলে টেট পাননি তাঁরাই জানে যন্ত্রণার মানে।

কিছুদিন আগে একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। তাতে মিছিলে সহস্র মুখের ভিড় কাটিয়ে একজন বলে উঠলেন - "মুখ্যমন্ত্রী বিয়ে করেনি ঠিক আছে, আমরা বিয়ে করতে চাই, চাকরি চাই। চাকরি নেই বলে গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে মাস্টার বা অন্য চাকরিওয়ালা ছেলের সঙ্গে। যন্ত্রণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। বুড়ো মা বাবাকে দেখতে পারছি না। রোজগার নেই, পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারছি না! "

Post a comment

0 Comments